ভিডিওতে ভয়ঙ্কর হড়পা বান, এক মাস পরেও স্তব্ধ উত্তরকাশী! তবুও চলছে বুকিং, কেন?

উত্তরকাশীর শান্ত পাহাড়ি উপত্যকার পাশ দিয়ে বয়ে চলা ক্ষীরগঙ্গা নদী এখন তার ভয়ংকর রূপের সাক্ষী। এক মাস আগে ভয়াবহ হড়পা বান এবং ভূমিধসের তাণ্ডবে বিধ্বস্ত হয়েছিল উত্তরাখণ্ড। এখনও সেই ক্ষত শুকোয়নি, কিন্তু পর্যটনের বাণিজ্যিক টানাপোড়েনে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। যেখানে সরকারিভাবে সব বুকিং বন্ধ, সেখানে এখনও কিছু হোমস্টেতে চলছে অবাধ বুকিং।
গত কয়েক বছরে পাহাড়ে মনসুন ট্র্যাভেলের প্রবণতা বাড়লেও চলতি বর্ষায় প্রকৃতির রোষ যেন তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। উত্তরাখণ্ডের ধরালী, হর্ষিল, এবং গঙ্গোত্রীর মতো অঞ্চলে একের পর এক ভূমিধস এবং মেঘভাঙা বৃষ্টিতে জনজীবন প্রায় থমকে। ক্ষীরগঙ্গা নদীর রুদ্ররূপ এতটাই ছিল যে অলিম্পিকের প্রায় ১.৪০ লক্ষ সুইমিং পুলের সমপরিমাণ জল কয়েক সেকেন্ডে সব ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। প্রায় ৩৬ কোটি কিউবিক মিটার পলির স্তূপ জমেছে বিভিন্ন স্থানে, যা নতুন করে রাস্তা তৈরিতে বিশাল বাধা সৃষ্টি করছে।
রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে বারবার সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছে এবং সরকারি পর্যটন সংস্থা জিএমভিএন (Garhwal Mandal Vikas Nigam) ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সমস্ত বুকিং এবং রেজিস্ট্রেশন বন্ধ রেখেছে। জিএমভিএন-এর রিজিওনাল ম্যানেজার বীরেন্দ্র সিং গোসাঁই জানিয়েছেন, “গঙ্গোত্রীর পথ বন্ধ রাখা হয়েছে। ফের ধস নামতে পারে যে কোনও মুহূর্তে। পর্যটকদের নিরাপত্তার কথা ভেবেই আমরা এই পদক্ষেপ নিয়েছি।” তিনি এই মুহূর্তে উত্তর ভারত ভ্রমণের পরিকল্পনা স্থগিত রাখার পরামর্শ দিয়েছেন।
তবে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে স্থানীয় কিছু হোমস্টে এবং ট্যুর অপারেটরদের ক্ষেত্রে। হর্ষিলের এক হোমস্টে মালিক বলেন, “এখন আবহাওয়া খারাপ ঠিকই, তা বলে কি পর্যটকরা ঘরে বসে থাকবেন? গঙ্গোত্রীর রাস্তা তো খোলা রয়েছে।” যেখানে সরকারিভাবে নিষেধাজ্ঞা আছে, সেখানে তার হোমস্টেতে ১ সেপ্টেম্বর থেকেই বুকিং চলছে। উত্তরকাশীর আরেক হোমস্টে ম্যানেজারও একই কথা বলেন।
কলকাতা-ভিত্তিক এক ট্যুর অপারেটর শমীক ভট্টাচার্য তীর্থযাত্রীদের ভিন্ন মানসিকতার কথা তুলে ধরেন। তাঁর মতে, “বিপর্যয় বা খারাপ আবহাওয়া পর্যটকদের মনে উদ্বেগ তৈরি করলেও তীর্থযাত্রীদের ক্ষেত্রে বিষয়টি একটু অন্য। তাঁরা মনে করেন, ঈশ্বর দর্শনের পথে কোনও দুর্ঘটনা ঘটলে একেবারে ঈশ্বরের কাছে পৌঁছে যাওয়াও নাকি সৌভাগ্যের।” এই ধরনের মানসিকতা অনেক সময় বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
অভিজ্ঞ ট্রেকার ও পর্বতারোহী বসন্ত সিংহরায় ‘মনসুন ট্র্যাভেল’ নিয়ে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন। তাঁর মতে, বর্ষায় পাহাড় এড়িয়ে চলা উচিত। তিনি বলেন, “অ্যাডভেঞ্চার সব সময়ই ঝুঁকির, কিন্তু সেই রোমাঞ্চের জন্য জীবনের ঝুঁকি নেওয়ার কোনো মানে হয় না।” তিনি আরও বলেন, আবহাওয়া পরিবর্তনের সঙ্গে পাহাড়ের চরিত্রও বদলাচ্ছে, তাই ভ্রমণ করার আগে ভালোভাবে গবেষণা করে পরিকল্পনা করা জরুরি। প্রকৃতিকে তার নিজের সময় দিতে হবে, নয়তো সে ফুঁসে উঠে তাণ্ডব চালাবে।