বিশেষ: জন্মাষ্টমীতে গ্রামে গ্রামে হয় ‘নারকেল কাড়াকাড়ি’ খেলা, জেনেনিন প্রাচীন এই খেলার নিয়ম?

সময় বদলেছে, আধুনিকতার ছোঁয়ায় বাংলার অনেক প্রাচীন ঐতিহ্য আজ প্রায় বিলুপ্ত। তবে রাঢ়বাংলার প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে কিছু ঐতিহ্য আজও টিকে আছে, যার মধ্যে অন্যতম হলো নন্দ উৎসব উপলক্ষে আয়োজিত ‘নারকেল কাড়াকাড়ি’ খেলা। একসময়ে জমিদার এবং বনেদি পরিবারের পৃষ্ঠপোষকতায় শুরু হওয়া এই খেলাটি আজও নানুর, ময়ূরেশ্বর-সহ বীরভূমের বিভিন্ন গ্রামে পালিত হয় এবং এর আকর্ষণ বিন্দুমাত্র কমেনি।

জনশ্রুতি অনুযায়ী, মূলত বিনোদনের জন্যই জমিদার এবং বর্ধিষ্ণু পরিবারের লোকেরা এই খেলার সূচনা করেছিলেন। নন্দ উৎসব, অর্থাৎ জন্মাষ্টমীর পরের দিন, গ্রামের রাধামাধব, রাধাবিনোদ বা রাধারমণের মতো মন্দির প্রাঙ্গণে এই খেলা অনুষ্ঠিত হতো। দুঃস্থ মানুষের কাছে নারকেল ছিল অত্যন্ত দুর্লভ, তাই এই খেলাটি তাদের জন্য এক বিশেষ আকর্ষণ ছিল।

খেলার নিয়ম:
খেলায় ব্যবহারের জন্য কয়েকটি নারকেলে তেল, মোবিল বা গ্রিজ মাখিয়ে পিচ্ছিল করা হতো। অনেক সময় নারকেলের ছোবড়ার ভিতরে সিকি, আধুলি বা এখনকার দিনে ৫-১০ টাকার কয়েনও ভরা হয়। প্রতিযোগীরা গোল হয়ে দাঁড়াতেন এবং উদ্যোক্তারা সেই গোল বৃত্তের মধ্যে নারকেল ছুড়ে দিতেন। যে প্রতিযোগী প্রথম নারকেলটি ধরতে পারতেন, তাকে কেন্দ্র করে শুরু হতো মূল কাড়াকাড়ি। পিচ্ছিল নারকেল হাতে ধরে রাখা ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সব বাধা পেরিয়ে যে প্রতিযোগী দু’হাত দিয়ে নারকেল উপরে ছুড়ে দিতে পারতেন, তিনিই হতেন বিজয়ী।

বর্তমান পরিস্থিতি:
এখন আর জমিদার প্রথা নেই এবং নারকেলও সহজলভ্য। তবুও এই ঐতিহ্যটি পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। নানুরের সুব্রত ভট্টাচার্য বা ময়ূরেশ্বরের অতুলকৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো স্থানীয়রা জানান, বাপ-ঠাকুরদার আমল থেকে চলে আসা এই প্রথাকে তারা আজও বাঁচিয়ে রেখেছেন।

বর্তমানে এই খেলায় গ্রামের যুবকরা উৎসাহের সঙ্গে অংশ নেন এবং আশপাশের গ্রাম থেকে বহু মানুষ এই খেলা দেখতে ভিড় করেন। পিচ্ছিল নারকেলের উপর প্রতিযোগিতার সময় জল ঢালা হয়, যা খেলাটিকে আরও কঠিন করে তোলে। এই ঐতিহ্যবাহী খেলাটি এখন বিভিন্ন ক্লাব এবং গ্রামবাসীর উদ্যোগে আয়োজিত হয়, যার জন্য বাড়ি বাড়ি গিয়ে চাঁদা তোলা হয়।

এক সময় এই উৎসবকে কেন্দ্র করে মন্দির প্রাঙ্গণে নহবত বসতো এবং জমিদার পরিবারের সদস্যরা কোঁচানো ধুতি-পাঞ্জাবি পরে খেলা দেখতেন। এখন সেই আড়ম্বর না থাকলেও, নারকেল কাড়াকাড়ি খেলাটি আজও বাংলার কৃষ্টি ও ঐতিহ্যের এক জীবন্ত অংশ হয়ে রয়েছে।