পাকিস্তানে স্বাধীনতা দিবসে পদক উৎসব, সেনাপ্রধানের নিজের হাতে নিজের পদক প্রদান

১৫ই আগস্ট, পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবসে এক অভূতপূর্ব ঘটনার সাক্ষী হলো দেশটির জনগণ। পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির নিজেই নিজেকে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বীরত্বসূচক পদক, ‘হিলাল-ই-জুরত’ প্রদান করেছেন। এই পদকটি ভারতের ‘মহাবীর চক্র’র সমতুল্য। সম্প্রতি ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সংঘটিত এক সংঘাতে নেতৃত্ব দেওয়ার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি এই সম্মাননা গ্রহণ করেন। শুধুমাত্র সেনাপ্রধানই নন, একই মঞ্চে পাকিস্তানের প্রায় সমস্ত শীর্ষ সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বকে পুরস্কৃত করা হয়েছে।

‘মারকা-ই-হক’-এর উদযাপন:
গত জুলাই মাসে পাকিস্তানের পরিকল্পনা মন্ত্রী আহসান ইকবাল ঘোষণা করেছিলেন যে এই বছরের স্বাধীনতা দিবসকে ‘মারকা-ই-হক’ বা ‘সত্যের যুদ্ধ’ হিসেবে পালন করা হবে। এই নামকরণ করা হয়েছে ভারতের ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর জবাবে পাকিস্তানের ‘অপারেশন বুনিয়ানুম মারসুস’ থেকে, যা গত ২২শে এপ্রিল কাশ্মীরের পহেলগাঁও-এ সন্ত্রাসী হামলার পর শুরু হয়েছিল।

পাক সামরিক বাহিনীর জনসংযোগ দপ্তর (ISPR) এক বিবৃতিতে জানায়, ২২শে এপ্রিল থেকে ১০ই মে পর্যন্ত যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষেত্রে “অটল সাহস, অসাধারণ সামরিক দক্ষতা, দৃঢ় বিশ্বাস এবং অবিচল দেশপ্রেম” প্রদর্শনের জন্য আসিম মুনিরকে এই পদক দেওয়া হয়েছে।

সেনা নেতৃত্বে পুরস্কারের বন্যা:
সেনাপ্রধান ছাড়াও, বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল জাহির আহমেদ বাবর সিদ্দিকি এবং নৌবাহিনীর প্রধান অ্যাডমিরাল নাভিদ আশরফকে ‘নিশান-ই-ইমতিয়াজ’ (সামরিক) সম্মানে ভূষিত করা হয়েছে। একই সম্মান পেয়েছেন যৌথ বাহিনীর চেয়ারম্যান জেনারেল সাহির শামশাদ মির্জাও।

এছাড়াও, আইএসআই প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল মুহাম্মদ আসিম মালিক, আইএসপিআর প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরিফ চৌধুরী, নৌবাহিনীর অপারেশন প্রধান ভাইস অ্যাডমিরাল রাজা রব নওয়াজ, বিমানবাহিনীর অপারেশন প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল আওরঙ্গজেব আহমেদ এবং সামরিক গোয়েন্দা প্রধান মেজর জেনারেল ওয়াজিদ আজিজসহ আরও অনেককে ‘হিলাল-ই-ইমতিয়াজ’ পদক দেওয়া হয়েছে।

সামরিক সদস্যদের মধ্যে ৮টি ‘সিতারা-ই-জুরত’, ৫টি ‘তামঘা-ই-জুরত’, ২৪টি ‘সিতারা-ই-বিসালত’, ৪৫টি ‘তামঘা-ই-বিসালত’, ১৪৬টি বিশেষ প্রশংসাপত্র এবং ২৫৯টি সেনাপ্রধানের প্রশংসা কার্ড বিতরণ করা হয়েছে।

রাজনৈতিক নেতাদেরও পদক প্রাপ্তি:
সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে রাজনৈতিক নেতৃত্বের পুরস্কার প্রাপ্তি। প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ যুদ্ধকালীন নেতৃত্বের জন্য পাকিস্তানের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ‘নিশান-ই-ইমতিয়াজ’ পেয়েছেন। একই পদক পেয়েছেন উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইশাক দার, যিনি ভারতের “কূটনৈতিক আক্রমণ প্রতিহত” করে আন্তর্জাতিক মহলে পাকিস্তানের অবস্থান জোরালোভাবে তুলে ধরেছেন বলে দাবি করা হয়েছে।

প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ, তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার, আইনমন্ত্রী আজম নজির তারার এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহসিন নাকভি—প্রত্যেকেই একই সম্মানে ভূষিত হয়েছেন।

পিপিপি প্রধান বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি, যিনি আন্তর্জাতিক মঞ্চে পাকিস্তানের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তাকেও ‘নিশান-ই-ইমতিয়াজ’ দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও নিউ ইয়র্ক, লন্ডন ও ব্রাসেলসে কূটনৈতিক কার্যক্রমে অংশ নেওয়া ড. মুসাদিক মালিক, সেনেটর শেরি রহমান, খুররম দস্তগীর, হিনা রব্বানি খার, সেনেটর ফয়সাল সুবজওয়ারি, তেহমিনা জানজুয়া ও জলিল আব্বাস জিলানিও ‘হিলাল-ই-ইমতিয়াজ’ পেয়েছেন।

পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যমের মতে, সরকার ও সামরিক বাহিনী একসঙ্গে এই পুরস্কার বিতরণের মাধ্যমে “ভারতের বিরুদ্ধে বিজয়” উদযাপন করতে চেয়েছে। তবে সমালোচকদের মতে, নিজেদের পদক নিজেরাই প্রদান করা এবং রাজনৈতিক নেতাদের সামরিক অভিযানের জন্য সম্মানিত করা পাকিস্তানের ইতিহাসে বিরল এবং এটি বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।