বিশেষ: জ্বালানি খরচ বাঁচাতে সাইকেল! জেনেনিন সাইক্লিংয়ের সুবিধে অসুবিধে

“কাঁদিস না খোকা, পেট্রোলের দাম কমে গেলেই বাবা তোর সাইকেল ফেরত দিয়ে দেবে”- ফেসবুক স্ক্রল করতে গিয়ে কার্টুনটায় চোখ আটকে গেল। খোকার ছোট্ট সাইকেল চেপে কাজে যাচ্ছেন বাবা আর ক্রন্দনরত খোকাকে আটকে রেখে তার মা বলছেন এই কথা।

দফায় দফায় জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধিতে পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় সব ধরনের যানবাহন ছেড়ে, এবার বাইসাইকেলে ঝোঁকার কথা ভাবছেন এমন অনেকেই। কেউ কেউ তো নিজেদের মোটরবাইকের সাথে বাইসাইকেল এক্সচেঞ্জও করতে চাচ্ছেন!

গত বছরের নভেম্বর থেকে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। ফলে দেশে বেড়েছে পরিবহন খরচ। গণপরিবহনে কিংবা নিজস্ব মোটরসাইকেল-গাড়িতে যাতায়াতকারী সব শ্রেণীর মানুষই সরাসরি ভুক্তভোগী এই মূল্যবৃদ্ধির। এই সময়ে নিত্যপণ্যের দামও বেড়েছে অন্তত ৪০ শতাংশ। মৌলিক প্রয়োজনীয় জিনিসগুলোতে কাটছাঁট করেও যখন খরচের হিসেব মেলাতে পারছেন না, তখন তেলবিহীন নিজস্ব যানবাহন বাইসাইকেলে স্বস্তি খুঁজছেন সাধারণ মানুষের একাংশ।

পরিবহন ব্যয়ের আকাশচুম্বী অবস্থার লাগাম টানতে সম্প্রতি সাইকেলে করে অফিস-শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত শুরু করেছেন এমন কয়েকজন তাদের অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে। অন্যদিকে মূল্যবৃদ্ধির অনেক আগে থেকেই যারা নিজেদের পছন্দে সাইকেলকে বেছে নিয়েছেন যাতায়াতের নিয়মিত মাধ্যম হিসেবে,

বাইসাইকেল শুধু টাকা বাঁচায় না, শরীরও সুস্থ রাখে। তাই আমরা যদি চেষ্টা করি গণপরিবহন ত্যাগ করে সাইকেলে অভ্যস্ত হওয়ার তাহলে আমাদের টাকাও বাঁচবে, শরীরও সুস্থ থাকবে। আর বাসের ভাড়া নিয়ে কন্ট্রাক্টর এর সঙ্গে ঝামেলাও হবে না।

“সাইকেলে যেমন টাকা লাগে না তেমন জ্যামেও পড়তে হয় না। সিগন্যালে আটকে থাকলে সাইকেল নিয়ে হেঁটে চলে যাওয়া যায়। আগে মোটরসাইকেলে যাতায়াতেও কাছাকাছি সময়ই লাগতো। কিন্তু রাস্তাঘাটে নানাধরনের পুলিশি ঝামেলা হতো প্রায়ই। তেলের দাম বাড়ার পর মোটরসাইকেল এড়িয়েই চলি যতটা সম্ভব

আবিরের ভাষ্যে, “বাসের উপর খুবই বিরক্ত আমি। এখন সেই বাসের অস্বস্তি, জ্যাম সব থেকে দূরেও আছি আবার সাইকেলে শারীরিক পরিশ্রম হওয়ায় রাতে ঘুমও ভালো হচ্ছে। সবদিক দিয়েই উপকৃত হচ্ছি। আমি চাই অনেক মানুষ যেন সাইকেলে নিয়মিত যাতায়াত করতে আগ্রহী হন। এটা যাতায়াতের বেস্ট অপশন। কেউ নিজে না শুরু করলে আসলে এর উপকারীতা বুঝবে না।”

নিয়মিত যাতায়াতের জন্য খুব বেশি দামের সাইকেলের দরকার নেই। ১০-১২ হাজার টাকা দামের সাইকেল দিয়েই শুরু করা যেতে পারে। সবজায়গায় সাইকেল পার্কিং এর সুবিধা না থাকায় সাইকেল চুরি হয়ে যাওয়ার ভয়টাও রাখতে হয় মাথায়।

রোজকার যাতায়াতে মোটরবাইকে তেল বাবদ খরচ হতো প্রায় ১৩৫ টাকা। সাথে পার্কিং খরচ, কিছুদিন পরপর বাইক মেরামত খরচ তো ছিলোই। ছাত্র থাকাকালীন বাইকের পেছনে এত খরচ মেটানো বেশ কঠিনই হয়ে গিয়েছিল তার জন্য। এসব সমস্যা থেকে বেশ খানিকটাই রেহাই মিলেছে নিয়মিত সাইকেল যাতায়াতে।

“সাইকেলে নিজের ব্যক্তিস্বাধীনতা বজায় থাকে। গণপরিবহনে মেয়ে-ছেলে নির্বিশেষে সবাইকেই হ্যারাসমেন্টের শিকার হতে হয় প্রায়ই। সাইকেলে এই সমস্যা নেই। শারীরিক কসরতের কারণে সাইক্লিং করলে মনও ভালো থাকে। আমার অন্যান্য বন্ধুদের চেয়ে অনেক কম ডিপ্রেশনে ভুগি আমি। সাইকেলে চড়ার সময় মনে হয় আমি যেন হাওয়ায় উড়ছি। পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় ৫০ বছর বয়সী এক দাদীও তার কর্মক্ষেত্রে যাতায়াতের জন্য নতুন করে সাইক্লিং শিখছেন আমার কাছে।”

শরীরের আকার-আকৃতির সাথে সাইকেলের মাপের গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আছে বলে জানান এই সাইক্লিস্ট। প্রত্যেকের শরীরের গঠন অনুযায়ী সাইকেল না ব্যবহার করলে দীর্ঘদিন পর পিঠ ব্যথা, কোমর ব্যথার মতো নানা সমস্যায় পড়তে পারেন।

দেশের রাস্তায় সাইকেলের লেন না থাকায় অসুবিধার আক্ষেপ জানিয়েছেন। রাস্তায় বড় গাড়ির বেপরোয়া ড্রাইভিং এড়িয়ে সাবধানে চলাচলের পরামর্শ দেন তারা।

যাতায়াতের জন্য প্রয়োজনীয় সময়ের কিছু আগে বের হতে হবে রাস্তায়, সাইক্লিং জার্সি পরে যাতায়াত করতে হবে, সাইকেল থামানোর পর অতিরিক্ত ঘাম এড়াতে বাতাসযুক্ত স্থানে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতে হবে, সম্ভব হলে অফিসের জামা-কাপড় লকারে রাখা বা সাথে বহন করে নিয়ে যাওয়ার অভ্যাস রাখতে হবে। এই কয়েকটি দিক মেনে চললে অফিসে ফিটফাট থাকার ক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধকতা তৈরি হতে দেয় না সাইক্লিং।