বিশেষ: মহাকাশে শিশুর জন্ম কি আদৌ সম্ভব? জেনেনিন কি বলছে বিজ্ঞানীরা?

মঙ্গল গ্রহে মানব অভিযানের পরিকল্পনা যখন জোর কদমে এগোচ্ছে, তখন নতুন করে মাথাচাড়া দিচ্ছে মহাকাশে মানুষের প্রজনন এবং সন্তান জন্মদানের বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ। প্রশ্ন উঠছে, মঙ্গলে যাওয়া এবং ফিরে আসার পুরো সময়টা যখন একটি মানব গর্ভকালের সমান হতে পারে, তখন মহাকাশের প্রতিকূল পরিবেশে গর্ভধারণ ও নিরাপদে সন্তান জন্ম দেওয়া আদৌ সম্ভব কি না। বিজ্ঞানবিষয়ক সাইট ‘সায়েন্স অ্যালার্ট’ এই বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

মাধ্যাকর্ষণহীনতা: গর্ভধারণ ও প্রসবের মূল চ্যালেঞ্জ
বিজ্ঞানীদের মতে, মাধ্যাকর্ষণের অভাব মহাকাশে গর্ভধারণকে শারীরিকভাবে কঠিন করে তুলতে পারে। তবে, একবার ভ্রূণ জরায়ুতে স্থাপন করা সম্ভব হলে গর্ভাবস্থার প্রাথমিক পর্যায় পৃথিবীর মতোই স্বাভাবিকভাবে চলতে পারে। আসল জটিলতা শুরু হয় নবজাতকের জন্ম ও যত্ন নিয়ে। বিজ্ঞানী অরুন ভি. হোল্ডেনের গবেষণা অনুসারে, মহাকাশে মাধ্যাকর্ষণ না থাকায় তরল পদার্থ এবং মানুষ ভেসে থাকে, যা সন্তান প্রসব ও শিশুর যত্ন নেওয়ার কাজকে অত্যন্ত জটিল করে তোলে। পৃথিবীতে শিশুকে ঠিকভাবে ধরে রাখা বা খাওয়ানোর মতো সহজ কাজগুলোও মাধ্যাকর্ষণের অভাবে মহাকাশে দুরূহ হয়ে দাঁড়াবে।

আশ্চর্যজনকভাবে, গর্ভে থাকা একটি ভ্রূণ ইতিমধ্যেই অনেকটা মাধ্যাকর্ষণহীন পরিবেশে বেড়ে ওঠে। ভ্রূণটি ‘এমনিওটিক’ তরলের ভেতরে ভেসে থাকে, যা একে ভাসিয়ে রাখে এবং বাইরের ধাক্কা থেকে সুরক্ষা দেয়। এই ভেসে থাকার অবস্থা মহাকাশে নভোচারীদের ওজনহীন অবস্থার সঙ্গে অনেকটা মেলে। গবেষকরা আরও বলছেন, নভোচারীরা পানির ট্যাংকের মধ্যে যে মাধ্যাকর্ষণ-সদৃশ পরিবেশে হাঁটার প্রশিক্ষণ পান, সেটিও গর্ভের ভেতরের পরিবেশের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। তবে সমস্যা কেবল মাধ্যাকর্ষণের অভাব নয়, আরও অনেক জটিলতা রয়েছে।

মহাজাগতিক রশ্মি: গর্ভবতী মা ও শিশুর জন্য মারাত্মক হুমকি
পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের বাইরে সবচেয়ে ভয়ংকর হুমকিগুলোর মধ্যে একটি হলো কসমিক রে বা মহাজাগতিক রশ্মি। এগুলি অত্যন্ত উচ্চ-শক্তির কণা বা পরমাণুর কেন্দ্র, যা প্রায় আলোর গতিতে মহাকাশে ছুটে চলে। গবেষকরা জানাচ্ছেন, প্রোটন ও নিউট্রন দিয়ে গঠিত এই ঘন কণিকাগুলি যখন মানুষের দেহের কোষে আঘাত করে, তখন তা মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। গভীর মহাকাশ অভিযানের জন্য এই ঝুঁকি বিশেষভাবে উদ্বেগের কারণ, কারণ এটি গর্ভবতী মা এবং গর্ভস্থ শিশুর শরীরে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি ঘটাতে পারে।

পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল এবং চৌম্বক ক্ষেত্র বেশিরভাগ মহাজাগতিক রশ্মি থেকে মানুষকে রক্ষা করে। কিন্তু মহাকাশে এই সুরক্ষা থাকে না, যেখানে মানুষ সরাসরি এই ক্ষতিকর রশ্মির মুখে পড়ে। মহাজাগতিক রশ্মি যখন মানবদেহের সঙ্গে সংঘর্ষ করে, তখন তা নির্দিষ্ট কোষ বা কোষের ভেতরের অংশকে নষ্ট করে দিলেও, আশেপাশের টিস্যু অক্ষত থাকতে পারে। তবে, যদি ডিএনএতে আঘাত করে, তাহলে মিউটেশন বা জেনেটিক পরিবর্তন ঘটাতে পারে, যা ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। অনেক সময় কোষের সরাসরি ক্ষতি না হলেও, এই রশ্মির প্রভাবে দেহে এক ধরনের প্রদাহ তৈরি হয়, যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে অতিরিক্ত সক্রিয় করে সুস্থ কোষের ক্ষতি করতে পারে।

গর্ভাবস্থার বিভিন্ন পর্যায়ে ঝুঁকি
গর্ভাবস্থার প্রথম কয়েক সপ্তাহ ভ্রূণের দ্রুত কোষ বিভাজন এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তৈরির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল। এই সময়ে শক্তিশালী মহাজাগতিক রশ্মি ভ্রূণের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। যদিও ভ্রূণ খুব ছোট হওয়ায় সরাসরি আঘাত পাওয়ার ঝুঁকি কম থাকে, এমন কিছু ঘটলে তা গর্ভপাতের কারণ হতে পারে।

গর্ভাবস্থার অগ্রগতির সাথে সাথে মহাজাগতিক রশ্মির ঝুঁকি ভিন্নভাবে আসে। প্রথম ত্রৈমাসিকের শেষে যখন প্লাসেন্টার রক্ত সঞ্চালন সম্পূর্ণভাবে গড়ে ওঠে এবং ভ্রূণ ও জরায়ুর দ্রুত বৃদ্ধি ঘটে, তখন জরায়ু মহাজাগতিক রশ্মির জন্য একটি বড় লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। এসব রশ্মি জরায়ুর পেশিতে আঘাত করলে তা সংকোচন শুরু করতে পারে এবং সময়ের আগেই শিশুর জন্ম বা প্রিম্যাচিউর লেবার ঘটাতে পারে। মহাকাশের মতো সীমিত চিকিৎসা সুবিধার পরিবেশে এমন আগাম প্রসব নানা জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।

নবজাতকের বিকাশে প্রভাব
মহাকাশে জন্ম নেওয়া শিশুর সামনে কিছু বিশেষ বিকাশগত সমস্যা আসতে পারে। মাধ্যাকর্ষণের অভাবে শিশুর দেহের সঠিক অবস্থান বুঝতে সাহায্য করা এবং দেহের সমন্বয় বিকাশে বাধা দিতে পারে। ফলে শিশুর জন্য মাথা তোলা, বসা, হামাগুড়ি দেওয়া এবং হাঁটা-চলা শেখার মতো গুরুত্বপূর্ণ শারীরিক দক্ষতা অর্জন করা কঠিন হয়ে পড়বে।

গবেষকরা আরও বলছেন, শিশু জন্মানোর পরও মহাজাগতিক রশ্মির ঝুঁকি কমে যায় না। কারণ শিশুর মস্তিষ্ক তখনও বিকাশ ও বৃদ্ধি পেতে থাকে। দীর্ঘ সময় ধরে মহাজাগতিক রশ্মির সংস্পর্শে থাকার ফলে মস্তিষ্কে স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে, যা শিশুর বুদ্ধি, স্মৃতি, আচরণ এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

সব মিলিয়ে, মহাকাশে একটি শিশু জন্ম নেওয়া কাগজে-কলমে সম্ভব মনে হলেও, এর জন্য এখনও অনেক বড় বড় শারীরিক, পরিবেশগত এবং চিকিৎসা সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করা বাকি। মানবতাকে মঙ্গল গ্রহে স্থায়ী বসতি স্থাপন করতে হলে এই মৌলিক প্রশ্নগুলির সমাধান অত্যাবশ্যক।