দূর্গাঠাকুর দেখতে কাটতে হবে ৩০০ টাকার টিকিট! যত ইচ্ছা তুলুন ছবি, এবার বড় চমক শহরের এই ৩ পুজোয়

বাঙালির প্রাণের পুজো দুর্গাপূজা এখন ইউনেস্কোর ‘হেরিটেজ’ তকমা পেয়েছে, আর বিসর্জন পরিণত হয়েছে এক জমজমাট ‘কার্নিভালে’। কালের নিয়মে সাবেকি প্রতিমার অঙ্গে থিমের বেশ লেগেছে, বারোয়ারি পুজোয় মিশেছে কর্পোরেট ছাপ। তবে কিছু বিষয় আজও বদলায়নি – রাত জেগে, লাইনে ঠায় দাঁড়িয়ে ঠাকুর দেখার ক্লান্তিহীন আনন্দ এখনও আমবাঙালির অবিচ্ছেদ্য অংশ। পুজোর আগে ভিআইপি পাস জোগাড় করার হুড়োহুড়ি পড়ে ঠিকই, কিন্তু টিকিট কেটে পুজো দেখার কথা হয়তো কেউ ভাবেননি! এবার কলকাতার তিনটি মণ্ডপে এই চমক নিয়ে আসা হয়েছে – একটি প্যান্ডেল দেখতে ১০০-১৫০ টাকা!
মহালয়ার আগে টিকিট কেটে দর্শনের ব্যবস্থা:
বর্তমানে মহালয়ার আগেই অনেক মণ্ডপ উদ্বোধন হয়ে যায় এবং সাধারণ মানুষের জন্য খুলে দেওয়া হয়। ফাঁকায় ফাঁকায় ঠাকুর দেখার জন্য অনেকেই এই দিনগুলোতে বেরিয়ে পড়েন। এবার এই সময়ে ঠাকুর দেখতে গেলে কাটতে হবে টিকিট। কলকাতার তিনটি মণ্ডপে এই নতুন ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে:
বালিগঞ্জ কালচারাল
দমদম পার্ক ভারত চক্র
কেন্দুয়া শান্তি সঙ্ঘ
এই তিনটি পুজো মণ্ডপেই মহালয়ার আগে অর্থাৎ ১৯, ২০ ও ২১ সেপ্টেম্বর টিকিট কেটে প্রবেশ করতে হবে। টিকিটের মূল্য এক জনের জন্য ১০০ টাকা, দু’জনের জন্য ১৫০ টাকা, তিন জনের জন্য ২০০ টাকা এবং চার জনের জন্য ৩০০ টাকা। টিকিট কাটা যাবে অনলাইনে। টিকিট কেটে সন্ধ্যা ৬টা থেকে ভোর ৩টা পর্যন্ত ঠাকুর দেখা যাবে। এই তিনটি পুজোরই শিল্পী সুশান্ত শিবানী পাল।
বিতর্ক ও পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি:
এই নতুন ব্যবস্থা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, শিল্প প্রদর্শনে টিকিট কাটাই যেতে পারে, কারণ এটি একটি নির্দিষ্ট সময়ে সীমিত সংখ্যক লোককে মানসম্পন্ন অভিজ্ঞতা দেবে। তবে অনেকেই মনে করছেন, এতে বাঙালির সাবেকিয়ানার আবেগ ধাক্কা খাবে। তাঁদের মতে, লাইনে দাঁড়িয়ে, ভিড় টপকে ঠাকুর দেখাতেই আসল আনন্দ।
বালিগঞ্জ কালচারালের উদ্যোক্তা অঞ্জন উকিল এই ব্যবস্থার কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন, “বিদেশ থেকে অনেকে এখন বাংলার দুর্গাপূজা দেখতে আসছেন। অনেক বয়স্ক মানুষও আসেন। তাঁদের পক্ষে ভিড় ঠেলে প্রবেশ করা সম্ভব নয়। ভিড়ের মধ্যে শিল্পটা উপভোগ করার সুযোগ হয় না। ছবি তোলার সুযোগও পান না মানুষ। এই ব্যবস্থায় সেই সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে।” অনেকে মনে করিয়ে দিচ্ছেন, বিদেশেও কোনো ফেস্টিভ্যালে প্রবেশ করতে গেলে টিকিট কাটার ব্যবস্থা থাকে, তাহলে বাংলার দুর্গাপূজা কেন নয়!
শিল্পী সুশান্ত শিবানী পাল আশ্বস্ত করে বলছেন, বাংলার পুজো সর্বজনীনই থাকছে। মহালয়ার পর সবাই এমনিতেই ঠাকুর দেখতে পারবেন। কিন্তু দেবীপক্ষের আগে শিল্পটা মানুষের কাছে পৌঁছে দিতেই এই ব্যবস্থা। শিল্পী বলেন, “হেরিটেজ স্বীকৃতি পাওয়ার পর অনেক মানুষ বাংলার এই পুজো দেখতে চাইছে। দেশের অনেক শিল্পমনস্ক মানুষও দেখতে চাইছেন। তাই এমন ব্যবস্থা।”
অন্যদিকে, এই ব্যবস্থার বিরোধী মতও রয়েছে। শহরের আর এক পুজোর উদ্যোক্তা সজল ঘোষ বলেন, “পুজোর বারোয়ারি এতে এসেন্স নষ্ট হয়ে যাবে।” তিনি আরও মনে করেন যে, এর ফলে সমাজে একটা বিভেদ চলে আসবে।
আগামী ২১ সেপ্টেম্বর মহালয়া। তার আগে এই তিন দিনের টিকিট-ব্যবস্থা কলকাতার দুর্গাপূজার ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় যোগ করতে চলেছে। এই উদ্যোগ কতটা সফল হয় এবং ভবিষ্যতে অন্যান্য পুজো কমিটিগুলোও এই পথে হাঁটে কিনা, সেটাই এখন দেখার বিষয়।