গল্ফগ্রিনের রহস্যময়ী নারী, পরিচয় বিভ্রাটে ঘনীভূত হচ্ছে জল্পনা, নেপথ্যে দালাল চক্রের অনুমান

গল্ফগ্রিন থেকে গ্রেফতার হওয়া রহস্যময়ী নারীর আসল পরিচয় নিয়ে এখনও অন্ধকারে কলকাতা পুলিশ। জেরায় অভিযুক্ত যুবতী, যিনি নিজেকে শান্তা পাল নামে পরিচয় দিচ্ছেন, কখনও বলছেন তিনি মডেল, কখনও বিমান সংস্থার কর্মী, আবার কখনও দাবি করছেন সঞ্চালিকা। এই বহুমুখী পরিচয় রহস্যকে আরও গভীর করে তুলছে। পার্ক স্ট্রিট থানা থেকে এই চাঞ্চল্যকর মামলার তদন্তভার এখন কলকাতা পুলিশের গুন্ডা দমন শাখা (অ্যান্টি রাউডি স্কোয়াড, ARS)-এর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।

গত সোমবার, প্রায় আঠাশ বছর বয়সী এই যুবতীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এরপর তাকে আদালতে পেশ করে নিজেদের হেফাজতে নেওয়া হয়। গ্রেফতারের সময় গল্ফগ্রিনের যে ফ্ল্যাটে তিনি থাকতেন, সেখানে তল্লাশি চালিয়ে আধার কার্ড, ভোটার কার্ড, রেশন কার্ডের মতো ভারতীয় নথি উদ্ধার হয়। একইসঙ্গে, কিছু বাংলাদেশি নথি এবং বাংলাদেশের একটি বিমান সংস্থার পরিচয়পত্রও পাওয়া গেছে, যা থেকে জানা যায় শান্তা আসলে বাংলাদেশের নাগরিক।

পরিচয় বিভ্রাটে নতুন মোড়:

লালবাজার সূত্রে খবর, হেফাজতে নেওয়ার পর জেরার মুখে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আসতে শুরু করেছে। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, শান্তা মূলত বাংলাদেশের নাগরিক এবং সেখানে একটি বিমান সংস্থায় কাজ করতেন। তবে কোনো কারণে তার চাকরি চলে যায়। বাংলাদেশে তিনি মডেল হিসেবেও কাজ করেছেন বলে জানা গেছে। বিমান সংস্থায় কাজ করার সুবাদে বিভিন্ন দেশে তার যাতায়াত ছিল, যার মধ্যে কলকাতাও অন্যতম।

কলকাতায় যাতায়াতের সময় কয়েকজনের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। সেই সূত্র ধরেই ২০২০ সালে তিনি একটি আধার কার্ড তৈরি করেন। তবে পাকাপাকিভাবে কলকাতায় থাকতে শুরু করেন কয়েকমাস আগে, ঠিক যখন তার বাংলাদেশের বিমান সংস্থার চাকরি চলে যায়। প্রথমে তিনি পার্ক স্ট্রিট থানা এলাকায় ভাড়া থাকতেন, তারপর গল্ফগ্রিনে চলে আসেন। এই সময়ের মধ্যে কলকাতায় তিনি মডেল ও সঞ্চালিকা হিসেবেও কাজ করেছেন।

জাল ভারতীয় নথি ও পাসপোর্টের আবেদন:

কলকাতা পুলিশ সূত্র মারফত জানা গেছে, পার্ক স্ট্রিটে থাকার সময় শান্তা রেশন কার্ড-সহ আরও কিছু ভারতীয় নথি তৈরি করান। এরপর তিনি ভারতীয় পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেন। এই একটি কাজই তাকে পুলিশের চোখে সন্দেহভাজন করে তোলে। কারণ, তার রেশন কার্ড-সহ অন্যান্য নথি পার্ক স্ট্রিটের একটি ঠিকানার হলেও, আধার কার্ডটি বর্ধমানের একটি ঠিকানার। এই অসঙ্গতি থেকেই পুলিশের সন্দেহ বাড়ে এবং তদন্ত শুরু হয়। ফলস্বরূপ, গ্রেফতার হন শান্তা পাল। তার কাছ থেকে ভারত ও বাংলাদেশের বহু নথি উদ্ধার হয়েছে।

এই মুহূর্তে কলকাতা পুলিশের কোনো উচ্চপদস্থ আধিকারিক এই বিষয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে রাজি নন। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক উচ্চপদস্থ আধিকারিক জানিয়েছেন, “গোটা ঘটনার তদন্ত চলছে। ওই মহিলা কেন কলকাতায় এসেছিলেন? কী কারণে পাসপোর্টের আবেদন জানিয়েছিলেন, সে বিষয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।”

রহস্যময় ‘স্বামী’ মহম্মদ আসরাফ:

গল্ফগ্রিনের ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার হওয়া নথিপত্রের মধ্যে মহম্মদ আসরাফ নামে এক ব্যক্তির পাসপোর্টও রয়েছে। পুলিশ সূত্রে খবর, জেরায় শান্তা এই ব্যক্তিকে তার স্বামী হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন এবং জানিয়েছেন যে বর্তমানে তিনি অন্ধ্রপ্রদেশে থাকেন।

এখন পুলিশ খতিয়ে দেখছে, কে এই মহম্মদ আসরাফ? তিনি কি সত্যিই শান্তার স্বামী, নাকি ভারতীয় পাসপোর্ট পেতে শান্তা তাকে স্বামী হিসেবে দেখিয়েছিলেন? এই যুবতীর আসল নাম কি সত্যিই শান্তা, নাকি তার অন্য কোনো পরিচয় আছে? কী উদ্দেশ্যে তিনি ভারতে এসেছিলেন? কেনই বা পাসপোর্ট করাতে চাইছিলেন? কেন তার চাকরি চলে গিয়েছিল এবং কেনই বা তিনি বিদেশে যেতে চাইছিলেন?

একইসঙ্গে তদন্তকারীরা জানার চেষ্টা করছেন, শান্তা কীভাবে ভারতীয় নথি তৈরি করালেন? এর পেছনে কোনো বড় দালালচক্র জড়িত আছে কিনা, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পুলিশের অনুমান, এই ঘটনার তদন্তের মাধ্যমে একটি বড় দালালচক্রের পর্দাফাঁস হতে পারে। লালবাজারের গোয়েন্দারা মনে করছেন, তদন্ত যত এগোবে, ততই এই বিষয়ে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আসবে।