দাঁতনের ‘বারাসতী’ গ্রাম, যেখানে মিলেছে চৈতন্য মহাপ্রভুর পায়ের ছাপ, দু’নদী স্রোতের নামে গ্রামের নামকরণ

বাংলার আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা ইতিহাসের অসংখ্য অধ্যায়, যা শত শত বছরের প্রাচীন ছোট ছোট গ্রামগুলিতে আজও জীবন্ত। এমনই এক ঐতিহাসিক জনপদ পশ্চিম মেদিনীপুরের দাঁতন, যা বাংলা-ওড়িশা সীমান্তে এক ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দাঁতন মূল শহর থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার দূরে, সুবর্ণরেখা নদীর তীরবর্তী এক ছোট্ট গ্রাম ‘বারাসতী’, যার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে চৈতন্য মহাপ্রভুর জীবন কাহিনী এবং যার নামকরণ নিয়ে রয়েছে এক অবাক করা কিংবদন্তি।
এই নদীর পাড়ের ছোট্ট জনপদকে ঘিরে রয়েছে অগাধ পৌরাণিক কাহিনি এবং ইতিহাস। পশ্চিম মেদিনীপুরের প্রাচীন জনপদ দাঁতনের ইতিহাসে কান পাতলে যেমন চৈতন্যদেবের পুরী যাত্রা বা কালাপাহাড়ের ধ্বংসলীলার কথা শোনা যায়, তেমনই সামান্য কিছুটা দূরেই অবস্থিত বারাসতী গ্রামটি বহন করে চলেছে তার নিজস্ব এক সমৃদ্ধ ইতিহাস, যা অনেককে শিহরিত করবে।
চৈতন্যদেবের পদচিহ্ন ও বারাসতী নামের রহস্য:
ইতিহাস গবেষকদের মতে, পুরী যাত্রাকালে স্বয়ং চৈতন্য মহাপ্রভু এই বারাসতী এলাকায় বিশ্রাম নিয়েছিলেন এবং তাঁর পায়ের ছাপ রেখে গেছেন। জানা যায়, চৈতন্যদেবের তিরোধানের পর জয়ানন্দ রচিত ‘চৈতন্য মঙ্গল’ কাব্যে এই গ্রামের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
গবেষকদের বক্তব্য অনুযায়ী, সুবর্ণরেখা নদী ঝাড়গ্রাম, পশ্চিম মেদিনীপুর এবং ওড়িশা হয়ে প্রবাহিত হয়েছে। পশ্চিম মেদিনীপুর পার হলেই ওড়িশা রাজ্য। এই ওড়িশার সীমানা থেকে সামান্য কিছুটা দূরেই এই বারাসতী গ্রাম অবস্থিত। লোককথা ও ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, এই স্থানে সুবর্ণরেখা নদী দুটি স্রোতে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল।
আদিবাসী ভাষায় ‘বারিয়া’ শব্দের অর্থ ‘দুই’ এবং ‘সতি’ শব্দের অর্থ ‘স্রোত’। অর্থাৎ, এই এলাকার সুবর্ণরেখা নদীর দুটি স্রোত বয়ে গিয়েছিল বলেই গ্রামের নাম হয়েছে ‘বারাসতী’। চৈতন্য মঙ্গল কাব্যে দাবি করা হয়েছে যে, এই স্থানেই নাকি স্বয়ং চৈতন্যদেব বিশ্রাম নিয়েছিলেন এবং তারপর তিনি ক্রমশ পুরীর দিকে অগ্রসর হন।
স্বাভাবিকভাবেই, ইতিহাস এবং ঐতিহ্যের এক দারুণ মেলবন্ধন এই ছোট্ট গ্রাম বারাসতী, যা বেশ কয়েকশো বছরের প্রাচীন কাহিনী বুকে ধারণ করে চলেছে। এই গ্রাম শুধু একটি ভৌগোলিক স্থান নয়, এটি বাংলার সমৃদ্ধ ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক জীবন্ত স্মারক।