পাহাড়ে সর্বশিক্ষা অভিযানের অর্থ খরচে অনিয়ম? জিটিএ’র বিরুদ্ধে সরব বিজেপি, পাল্টা জবাব তৃণমূলের

দার্জিলিং ও কালিম্পং জেলায় কেন্দ্রীয় সরকারের সর্বশিক্ষা অভিযান প্রকল্পের আওতায় বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ হলেও, তা সঠিকভাবে গোর্খাল্যান্ড টেরিটোরিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (জিটিএ) খরচ করতে ব্যর্থ হয়েছে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে পাহাড়ের রাজনীতি এখন সরগরম। কেন্দ্রীয় সরকার সরাসরি জিটিএকে অর্থ দিলেও, এই দুই জেলায় অর্থ ব্যবহারে চরম ব্যর্থতা দেখা গেছে, যার ফলে প্রতি অর্থবর্ষেই বিপুল পরিমাণ টাকা ফেরত চলে যাচ্ছে।

ব্যয়ের করুণ চিত্র: দার্জিলিং ও কালিম্পংয়ে মাত্র ১৫২ কোটি টাকা খরচ
সর্বশিক্ষা অভিযানের মূল লক্ষ্য হলো স্কুলের পরিকাঠামোগত উন্নয়ন, যার মধ্যে শ্রেণিকক্ষ, শৌচাগার, পানীয় জলের ব্যবস্থা, আইসিটি ল্যাব, স্মার্ট ক্লাসরুম, ডিজিটাল শিক্ষার উপকরণ, শিক্ষক-শিক্ষিকা নিয়োগ, মিড ডে মিল ও প্রশিক্ষণ-সহ একাধিক কাজ অন্তর্ভুক্ত। সর্বশিক্ষা মিশন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯-২০ অর্থবর্ষ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষ পর্যন্ত ছয় বছরে এই প্রকল্পের অধীনে দার্জিলিং ও কালিম্পংয়ের জন্য মোট ৫৬০ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছিল। অথচ, এই সময়ের মধ্যে দুই জেলা মিলে ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে মাত্র ১৫২ কোটি টাকা। খরচের হার দেখলে দেখা যায়, দার্জিলিংয়ে মাত্র ৪২.৭৫ শতাংশ এবং কালিম্পংয়ে ৮.৪৫ শতাংশ অর্থ খরচ হয়েছে।

সংসদে প্রশ্ন তুললেন সাংসদ রাজু বিস্তা, ইচ্ছাকৃত দুর্নীতির অভিযোগ
জিটিএ কর্তৃক বরাদ্দ হওয়া অর্থের পর্যাপ্ত ব্যবহার না করতে পারার বিষয়টি নিয়ে দার্জিলিংয়ের সাংসদ রাজু বিস্তা সংসদের অধিবেশনেও প্রশ্ন তোলেন। পরে তিনি কেন্দ্রীয় শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জয়ন্ত চৌধুরীর কাছ থেকে প্রাপ্ত পরিসংখ্যান তুলে ধরেন, যেখানে ব্যয়ের এই করুণ চিত্র স্পষ্ট হয়।

সেই পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৯ অর্থবর্ষে দার্জিলিংয়ের ১০৬৬টি ও কালিম্পংয়ের ৪৭০টি স্কুল সর্বশিক্ষা অভিযানের আওতায় ছিল। ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে সংশ্লিষ্ট দার্জিলিং ও কালিম্পংয়ে স্কুলের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১০৭২টি ও ৪৭৯টি। বিগত ছয় বছরে দার্জিলিং এই প্রকল্পের অধীনে ৩০৮ কোটি ৫৪ লক্ষ টাকা বরাদ্দ পেলেও খরচ করেছে মাত্র ১৩১ কোটি টাকা (৪২.৭৫%)। একই সময়ে কালিম্পং ২৫১ কোটি ৯৫ লক্ষ টাকা পেয়েও খরচ করেছে মাত্র ২১ কোটি ৩০ লক্ষ টাকা (৮.৪৫%)। এর বিপরীতে, শিলিগুড়ি শিক্ষা জেলায় এই ছয় বছরে বরাদ্দ ছিল ২৬২ কোটি ৬৯ লক্ষ টাকা, কিন্তু সেখানে ব্যয় হয়েছে ৪৬১ কোটি ৮০ লক্ষ টাকা, অর্থাৎ বরাদ্দের তুলনায় প্রায় ৭৫ শতাংশ বেশি অর্থ খরচ হয়েছে।

রাজু বিস্তা প্রশ্ন তুলেছেন, “এটা কীভাবে হল? অতিরিক্ত অর্থ শিলিগুড়ি শিক্ষা জেলায় খরচ হয়েছে, তাতে কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু পাহাড়ে স্কুলের সংখ্যা কম নেই। দার্জিলিং জেলার পাহাড়ে স্কুলের সংখ্যা সমতলের তুলনায় অনেক বেশি। তারপরেও কেন বরাদ্দ অর্থ খরচ করা হচ্ছে না? জিটিএ বরাদ্দের টাকা ব্যবহারে ব্যর্থ। এতে পাহাড়ের পড়ুয়ারা উন্নত শিক্ষা পরিষেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।” তিনি আরও অভিযোগ করেন, “আমার সন্দেহ, ইচ্ছাকৃতভাবে পাহাড়ের বরাদ্দ অর্থ অন্যত্র সরিয়ে দিচ্ছে রাজ্য সরকার।”

জিটিএ ও তৃণমূলের পাল্টা জবাব
এই অভিযোগের বিষয়ে জিটিএ এবং তৃণমূল কংগ্রেস পাল্টা সুর চড়িয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জিটিএ’র শিক্ষা বিভাগের এক আধিকারিক বলেন, “বর্তমানে সর্বশিক্ষা অভিযানের কোনো অর্থ জিটিএ’র কাছে নেই। যখন যেমন বরাদ্দ মিলেছে, খরচ করা হয়েছে। তাছাড়া গত দু’বছর ধরে সর্বশিক্ষা অভিযানের অর্থ জিটিএতে আসে না। প্রস্তাব অনুসারে স্কুলের পরিকাঠামো উন্নয়নের কাজ করে বিল রাজ্য সরকারের কাছে পাঠানো হয়। তারাই সেই বিল মেটায়। কাজেই সাংসদ কোথা থেকে ওই তথ্য দিচ্ছেন, জানা নেই।”

জিটিএ’র মুখপাত্র শক্তিপ্রসাদ শর্মা বলেন, “দিল্লিতে থাকা সাংসদের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে বাস্তবের কোনো মিল নেই।” দার্জিলিং জেলা হিল তৃণমূল কংগ্রেসের সভানেত্রী শান্তা ছেত্রী বলেন, “কেন্দ্রীয় সরকার সময়মতো কোনো টাকাই বরাদ্দ করে না। আর সাংসদ যে তথ্য দিচ্ছেন তার কোনো ভিত্তি নেই। রাজ্য সরকার পাহাড়ের সবরকম উন্নয়ন করছে। শিক্ষার ক্ষেত্রেও রাজ্য সরকারই পাহাড়ে উন্নয়ন করছে।”

শিক্ষাবিদদের উদ্বেগ
উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সমর চক্রবর্তী এই প্রসঙ্গে বলেন, “শিক্ষাক্ষেত্রে বরাদ্দ হওয়া অর্থ সময়মতো ও সঠিক খাতে খরচ হওয়া উচিত বলে মনে করি। তা না-হলে এতে সমস্যা হয় পড়ুয়াদের। পাহাড়ে অনেক প্রত্যন্ত গ্রামে স্কুল রয়েছে। যেসব স্কুলের উন্নয়ন করাটা জরুরি। যদি সর্বশিক্ষা অভিযানের খাতে আসা অর্থ খরচ না-হয়ে থাকে, তাহলে তা দুর্ভাগ্যজনক। আমি আশা করব যাতে শিক্ষার সঠিক খাতে ওই অর্থ যাতে যথাযথভাবে খরচ করা হয়।”

এই বিতর্ক পাহাড়ের শিক্ষা ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে এবং জিটিএ-এর আর্থিক ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।