উৎসবের আগে সোনার ঝলকানি! মাথায় চাপ মধ্যবিত্তের, জানুন আজকের রেট?

আর মাত্র কয়েকটা মাস পরেই বিয়ের ভরা মরশুম। কিন্তু তার আগেই সোনার দামে যে আগুন লেগেছে, তাতে মধ্যবিত্ত বাঙালির কপালে গভীর চিন্তার ভাঁজ। বুধবার ফের একবার সমস্ত রেকর্ড ভেঙে খাঁটি ২৪ ক্যারেট সোনার দাম প্রতি ১০ গ্রামে ১ লক্ষ টাকার গণ্ডি পেরিয়ে গেছে, যা এক নতুন মাইলফলক। একই তালে পাল্লা দিয়ে ২২ ক্যারেট সোনাও পৌঁছে গেছে প্রতি ১০ গ্রামে ৯৩ হাজার টাকার ওপরে। এই লাগাতার মূল্যবৃদ্ধি উৎসব-পার্বণ এবং বিয়ের মতো সামাজিক অনুষ্ঠানগুলির বাজেটকে লণ্ডভণ্ড করে দিচ্ছে।
আন্তর্জাতিক অস্থিরতার ছায়া দেশীয় বাজারে:
বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, সোনার এই রকেট গতির পেছনে রয়েছে আন্তর্জাতিক অর্থনীতির জটিল সমীকরণ। ডলারের মূল্য বৃদ্ধি, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ‘নিরাপদ আশ্রয়’ (safe haven) হিসেবে সোনার প্রতি বাড়তি ঝোঁকই এর প্রধান কারণ। চলতি সপ্তাহে আমেরিকার ফেডারেল রিজার্ভের আসন্ন বৈঠক এবং সুদের হার সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের মনে আরও অস্থিরতা তৈরি করেছে, যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে সোনার দামে। যখন শেয়ার বাজার বা অন্যান্য বিনিয়োগের পথগুলি অনিশ্চিত মনে হয়, তখন সোনাকেই সবচেয়ে সুরক্ষিত সম্পদ হিসেবে দেখেন বিনিয়োগকারীরা, আর তার ফলস্বরূপ দাম বাড়ে হু হু করে।
কলকাতার চিত্র:
বুধবার কলকাতায় প্রতি ১০ গ্রাম ২৪ ক্যারাট সোনার দাম দাঁড়িয়েছে ₹১,০০,৮৭০। ২২ ক্যারাটের ক্ষেত্রে তা ₹৯৩,২৫০। কেবল কলকাতাই নয়, মুম্বই, দিল্লি, চেন্নাই, হায়দ্রাবাদ সহ দেশের অন্যান্য বড় শহরগুলিতেও একই চিত্র। গত এক মাসে সোনার দাম প্রায় ₹৪,০০০ থেকে ₹৫,০০০ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। এই প্রবণতা, যা মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে শুরু হয়েছে, তা এখন মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
বিয়ের মরশুম, অথচ মন ভার:
সামনেই শিবরাত্রি থেকে জন্মাষ্টমী পর্যন্ত একগুচ্ছ শুভ লগ্ন। বাঙালি পরিবারে এই সময়টাকেই মূলত বিয়ের জন্য বেছে নেওয়া হয়। সারা বছরের জমানো অর্থ দিয়ে মেয়ের বা ছেলের বিয়ের জন্য সোনার গয়না কেনেন বাবা-মায়েরা। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি সেই স্বপ্নকে ভেঙে দিচ্ছে। যাঁদের বিয়ের তারিখ ফিক্সড, তাঁরা বাধ্য হয়ে সামান্য কিছু কিনছেন বা পুরনো সোনা বদলে নতুন গড়ার কথা ভাবছেন। নিম্ন-মধ্যবিত্তদের কাছে এখন সোনার গয়না যেন এক অধরা স্বপ্ন।
ব্যবসায়ীদের হতাশাও স্পষ্ট:
শুধু ক্রেতারাই নন, সোনার দোকানেও বিরাজ করছে নিস্তব্ধতা। ব্যবসায়ীরা জানাচ্ছেন, গত এক সপ্তাহে গয়নার বিক্রি প্রায় ৩০-৪০ শতাংশ কমে গেছে। বহু মানুষ দোকানে এসে শুধু দাম জেনে ফিরে যাচ্ছেন। কিছু ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, মানুষ পুরনো সোনা বিক্রি করে তার সঙ্গে সামান্য কিছু যোগ করে নতুন গয়না নিচ্ছেন, অথবা ছোট গয়না নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। কিছু ক্রেতা আবার কিস্তিতে সোনা কেনার বিকল্প খোঁজ করছেন।
ভবিষ্যৎ কী?
বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, আন্তর্জাতিক অস্থিরতা যদি না কমে, তাহলে আগামী মাসগুলিতে সোনার দাম আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে দুর্গাপূজা, ধনতেরাস এবং দীপাবলির মতো উৎসবগুলিতে সোনার চাহিদা আরও বাড়বে, যা দামকে আরও উর্ধ্বমুখী করবে। তবে কেউ কেউ আশাবাদী, যদি ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার না বাড়ায় এবং ডলারের দাম নিয়ন্ত্রণে থাকে, তাহলে সাময়িকভাবে দাম স্থিতিশীল হতে পারে। কিন্তু সেই স্থিতিশীলতা মধ্যবিত্তকে কতটা স্বস্তি দেবে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। সোনার এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি কেবল পারিবারিক বাজেটেই প্রভাব ফেলছে না, বরং ছোট গয়নার ব্যবসায়ী এবং স্বর্ণশিল্পের সঙ্গে জড়িত কারিগরদের জীবনেও অনিশ্চয়তা নিয়ে আসছে।