জগদীপ ধনকড়ের আকস্মিক ইস্তফা, তবে কি নতুন উপরাষ্ট্রপতি নীতীশ কুমার? শুরু জোর জল্পনা

দেশের রাজনীতিতে হঠাৎই এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো। পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি থাকা সত্ত্বেও উপরাষ্ট্রপতি জগদীপ ধনখড়ের আকস্মিক পদত্যাগ সারাদেশে আলোড়ন ফেলেছে। তিনি স্বাস্থ্যগত কারণ দেখালেও, বিরোধীরা তা মানতে নারাজ। তাদের দাবি, নরেন্দ্র মোদীর সরকার তাঁকে উপরাষ্ট্রপতি ও রাজ্যসভার চেয়ারপার্সন করলেও, তিনি নাকি ক্রমাগত উপেক্ষার শিকার হচ্ছিলেন। কংগ্রেস তো আরও একধাপ এগিয়ে, জেপি নাড্ডা এবং কিরণ রিজিজুর আচরণে ধনখড় অসন্তুষ্ট ছিলেন বলেও অভিযোগ তুলেছে। তবে এই ইস্তফার সঙ্গে এবার জুড়ে গেল বিহারের রাজনীতি – জল্পনা তুঙ্গে, ধনখড়ের শূন্যস্থানে বসতে পারেন বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার।

বিজেপির অন্দরে নীতীশকে উপরাষ্ট্রপতি করার গুঞ্জন:

আশ্চর্যজনকভাবে, নীতীশকে উপরাষ্ট্রপতি করার এই দাবি সংযুক্ত জনতা দলের (জেডিইউ) কোনো নেতা করছেন না, বরং বিজেপির অন্দরেই এটি জোরালো হচ্ছে। বিহারের বিজেপি বিধায়ক হরিভূষণ ঠাকুর সংবাদ সংস্থা এএনআইকে (ANI) দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট জানান, “ধনখড়জি স্বাস্থ্যজনিত কারণে ইস্তফা দিয়েছেন, এ নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ নেই। তবে নীতীশ কুমার উপরাষ্ট্রপতি হলে বিহারের মানুষ খুশিই হবেন। এটা বিহারের জন্য সৌভাগ্য।” বিহারের বর্ষীয়ান বিজেপি নেতা ও মন্ত্রী প্রেমকুমারও একই সুরে কথা বলেছেন। তিনি বলেন, “কেন্দ্রীয় সরকারই সিদ্ধান্ত নেবে, তবে বিহার থেকে কেউ উপরাষ্ট্রপতি হলে আমি আনন্দিত হব।” অপর বিজেপি মন্ত্রী নীরজ কুমার সিংহ বাবলুও এই সম্ভাবনাকে স্বাগত জানিয়েছেন।

কৌশলী রাজনীতির আড়ালে বিহারের নির্বাচন:

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নীতীশকে উপরাষ্ট্রপতি করার এই জল্পনার পেছনে রয়েছে একাধিক গভীর কার্যকারণ। সামনেই বিহারে বিধানসভা নির্বাচন। ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিরোধীদের অভিযোগ, বিজেপিকে জেতাতে নির্বাচন কমিশন লক্ষ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ দিচ্ছে। বিহারে বিজেপি এখনও নিজের ক্ষমতায় একবারও জয়ী হতে পারেনি, তাই নীতীশ এবং তাঁর জেডিইউকে জোটসঙ্গী হিসেবে তাদের ভীষণ প্রয়োজন। কিন্তু এবারের নির্বাচনে আসন সংখ্যা বাড়বে বলে বিজেপি আশাবাদী। সেক্ষেত্রে নীতীশকে আবার মুখ্যমন্ত্রী করলে ভবিষ্যতে বিভিন্ন সিদ্ধান্তে সংঘাতের সম্ভাবনা বাড়তে পারে। এছাড়াও, সত্তরোর্ধ্ব নীতীশের হাতে মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব ন্যস্ত করা নিয়ে রাজ্য বিজেপির মধ্যে আপত্তি রয়েছে। তবে কেন্দ্রীয় বিজেপি নেতৃত্ব নীতীশকে চটাতে নারাজ। তাই, তাঁকে উপরাষ্ট্রপতি করে বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিহারে এক নতুন রাজনৈতিক চাল দেওয়া হচ্ছে বলে জল্পনা শুরু হয়েছে।

রাজ্যসভা পরিচালনা ও ‘পল্টুরাম’ নীতীশ:

সোমবার সন্ধ্যায় রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর কাছে ধনখড় তাঁর ইস্তফাপত্র পাঠান এবং মঙ্গলবার সকালেই তা গৃহীত হয়। মঙ্গলবার সংসদে ধনখড় অনুপস্থিত ছিলেন। তাঁর পরিবর্তে জেডিইউ-এর হরিবংশ নারায়ণ সিংহকে রাজ্যসভার চেয়ারের দায়িত্বে দেখা যায়। জানা গেছে, বাদল অধিবেশন চলাকালীন আপাতত তিনিই রাজ্যসভার অধিবেশন পরিচালনা করবেন। ২০২০ সাল থেকে রাজ্যসভার ডেপুটি চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন হরিবংশ। বিহারে বিধানসভা নির্বাচন না মেটা পর্যন্ত তিনিই রাজ্যসভা পরিচালনার দায়িত্বে থাকবেন।

নীতীশ কুমার একজন অত্যন্ত কৌশলী রাজনীতিক হিসেবে পরিচিত। বিহারে বারবার ক্ষমতাসীন সরকারের সমীকরণ বদলালেও, তিনি মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে নিজের চেয়ার ধরে রাখতে সফল হয়েছেন। বারবার শিবির বদলের জন্য ‘পল্টুরাম’ তকমা জুটলেও, তিনি নিজের নীতি থেকে একচুলও সরে আসেননি।

নীতীশের সিদ্ধান্তের সংশয়:

তবে, শেষ পর্যন্ত নীতীশ কুমার উপরাষ্ট্রপতির পদ গ্রহণ করেন কিনা, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, নীতীশ যদি উপরাষ্ট্রপতির পদ গ্রহণ করেন, সেক্ষেত্রে বিহারের রাজনীতিতে তাঁর ছেলে নিশান্ত কুমারের রাজনৈতিক সম্ভাবনা অনেকটাই কমে যাবে। ইতিমধ্যেই পরিবারতন্ত্রের দোহাই দিয়ে নিশান্তের বিরোধিতা শুরু হয়েছে। নীতীশ বিহার থেকে সরে গেলে, তাঁর ছেলের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎও টালমাটাল হয়ে যেতে পারে। তবে, নীতীশ শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত নেন, তা বিহার বিধানসভা নির্বাচনের পরই বোঝা যাবে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে, যদি বিজেপির থেকে জেডিইউ-এর আসন সংখ্যা কম হয়, তবেই নীতীশকে উপরাষ্ট্রপতি পদ গ্রহণে রাজি করানো সহজ হবে বলে একাংশ মনে করছে – যদি না নীতীশ আবার শিবির বদল করেন।