‘মেড ইন চায়না’ ফাইটার জেটেই বিপদে বাংলাদেশ, বাড়ছে আরও শিশুর মৃত্যু সংখ্যা

ঢাকার উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া বিমান দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও চার শিক্ষার্থীর মৃত্যু হওয়ায় মোট নিহতের সংখ্যা এখন ২৭। ইনস্টিটিউটের আবাসিক সার্জন ডা. শাওন বিন রহমান এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন, এবং উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে, নিহতদের মধ্যে ২৫ জনই শিশু, যাদের বয়স ১২ বছরের নিচে। বেশিরভাগ শিশুর শরীরের বড় অংশ পুড়ে গিয়েছিল। এই ভয়াবহ ঘটনায় আহত হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে এখনও ৭৮ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন, যার মধ্যে ৫ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।

সেনাবাহিনীর আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদফতর (আইএসপিআর) সূত্রে জানা গেছে, গত সোমবার দুপুরে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি এফ-৭ বিজিআই প্রশিক্ষণ বিমান ঢাকার কুর্মিটোলার বাংলাদেশ বিমানবাহিনী ঘাঁটি একে খন্দকার থেকে উড্ডয়নের পরপরই যান্ত্রিক ত্রুটির শিকার হয়। আইএসপিআর-এর তথ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনা মোকাবিলায় এবং ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে বিমানটির পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মো. তৌকির ইসলাম এটিকে জনবিরল এলাকায় নিয়ে যাওয়ার সর্বাত্মক চেষ্টা করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বিমানটি ঢাকার দিয়াবাড়িতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের দোতলা ভবনের ওপর বিধ্বস্ত হয়, যার ফলে এত বিপুল সংখ্যক শিশুসহ বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি ঘটে।

এফ-৭ যুদ্ধবিমান: ‘সাশ্রয়ী’ থেকে ‘বিপজ্জনক বোঝায়’

গত এক দশকে এফ-৭ যুদ্ধবিমানের বেশ কয়েকটি দুর্ঘটনা ঘটায়, এবারের মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর এই বিমানের কার্যকারিতা, যান্ত্রিক ত্রুটি এবং সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। চীনের তৈরি এফ-৭ যুদ্ধবিমান এক সময়ে বহু উন্নয়নশীল দেশের জন্য তুলনামূলক কম খরচে আকাশ প্রতিরক্ষার একটি বাস্তবসম্মত সমাধান হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ‘সাশ্রয়ী’ সমাধান এখন কার্যত একটি বিপজ্জনক বোঝায় পরিণত হয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। পাকিস্তান, বাংলাদেশ, নাইজেরিয়া, ইরানসহ আরও কয়েকটি দেশে ব্যবহৃত এই বিমানটি বর্তমানে প্রায়শই শিরোনামে আসে – দুর্ভাগ্যজনকভাবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দুর্ঘটনার কারণে।

চীনের জে-৭/এফ-৭: ইতিহাস ও বাংলাদেশ প্রসঙ্গে

এফ-৭ যুদ্ধবিমান তৈরি করে চীনের চেংদু এয়ারক্রাফ্ট করপোরেশন (সিএসি)। চীনের অভ্যন্তরীণ ব্যবহারের জন্য এটি জে-৭ নামে পরিচিত, তবে রপ্তানির সময় এর নামকরণ হয় এফ-৭। জে-৭ মূলত সোভিয়েত ইউনিয়নের বিখ্যাত মিগ-২১ যুদ্ধবিমানের চীনা সংস্করণ। ১৯৬০-এর দশকে সোভিয়েত প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে বিমানটি নির্মিত হলেও, চীনকে অসম্পূর্ণ তথ্য সরবরাহ করায় দেশটি ‘রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর মাধ্যমে নিজস্ব সংস্করণ তৈরি করে। ১৯৮০ ও ‘৯০ দশকে চীনের পক্ষ থেকে এই বিমানের একাধিক উন্নত সংস্করণ তৈরি করা হয় এবং পাকিস্তান, বাংলাদেশ, মিসর, শ্রীলঙ্কা, নাইজেরিয়া, জিম্বাবোয়ে, তানজানিয়াসহ বহু দেশে এটি রপ্তানি করা হয়। বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর কাছে মোট ৩৬টি এফ-৭ যুদ্ধবিমান রয়েছে। এর মধ্যে বেশির ভাগই এফ-৭ বিজিআই ভ্যারিয়েন্ট, তবে এফ-৭ এমবি ও এফটি-৭ ভ্যারিয়েন্টও ব্যবহৃত হয়।

বারবার দুর্ঘটনা: সুরক্ষা ও রক্ষণাবেক্ষণের প্রশ্ন

গত এক দশকে এফ-৭ যুদ্ধবিমানের একাধিক দুর্ঘটনা ঘটেছে, বিশেষ করে প্রশিক্ষণ চলাকালীন বা রুটিন টহল অভিযানে। এর আগে ২০১৮ সালের নভেম্বরে টাঙ্গাইলে একটি প্রশিক্ষণ বিমান দুর্ঘটনায় পড়ে, এতে বিমানটির পাইলট উইং কমান্ডার আরিফ আহমেদ নিহত হন। ২০১৭ সালের ২৭শে ডিসেম্বর কক্সবাজারে প্রশিক্ষণের সময় বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর দুটি প্রশিক্ষণ বিমান ভেঙে পড়েছিল। এরও আগে ২০১৫ সালের ১লা এপ্রিল রাজশাহীর শাহ মখদুম বিমানবন্দরে প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হয়ে তামান্না রহমান নামের একজন পাইলট নিহত হন। একই মডেলের বিমানের বারবার এই ধরনের দুর্ঘটনাগুলো বিমানবাহিনীর বহরে এই পুরনো চীনা যুদ্ধবিমানগুলির সুরক্ষা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং আপগ্রেডেশন নিয়ে গভীর উদ্বেগ ও প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এই ধরনের দুর্ঘটনার ফলে যে মানবিক বিপর্যয় ঘটছে, তা প্রতিরোধে দ্রুত পদক্ষেপের দাবি উঠছে সর্বস্তরে।