‘নির্মল জেলা’ বাঁকুড়ার ভয়ঙ্কর রূপ! ৭০% বাড়িতে নেই শৌচালয়, লাফিয়ে বাড়ছে ডায়েরিয়ায় আক্রান্তের সংখ্যা

‘নির্মল জেলা’ হিসেবে ঘোষিত বাঁকুড়ার জনস্বাস্থ্য পরিষেবার এক করুণ চিত্র এবার সামনে চলে এল। ডায়রিয়ার প্রকোপ দেখা দিতেই জেলার ‘নির্মল গ্রাম’ হিসেবে পরিচিত দুর্লভপুরে উঠে এল স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর কঙ্কালসার চেহারা। খোদ স্বাস্থ্য দফতরই স্বীকার করেছে, এই গ্রামে ৭০ শতাংশ বাড়িতেই নেই শৌচালয়! এমনকি, হাজার হাজার কোটি টাকার জল প্রকল্পের পরেও গ্রামবাসীরা বাধ্য হচ্ছেন পুকুরের নোংরা জল ব্যবহার করতে, যা জনস্বাস্থ্যে চরম বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কয়েক বছর আগেই ঘটা করে বাঁকুড়া জেলাকে ‘নির্মল জেলা’ হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছিল, এবং জেলা প্রশাসন পুরস্কারও পেয়েছিল। কিন্তু সেই ‘নির্মল’ ঘোষণার গোড়াতেই যে গলদ ছিল, তা প্রমাণ করে দিল দুর্লভপুর গ্রামের বর্তমান পরিস্থিতি।
ডায়রিয়ার প্রকোপ ও উন্মোচিত সত্য:
বাঁকুড়ার গঙ্গাজলঘাটি ব্লকের দুর্লভপুর গ্রামের লোহার পাড়া, যা মূলত ক্ষেতমজুরদের বাসস্থান। সম্প্রতি এই গ্রামেই ব্যাপক হারে ডায়রিয়ার প্রকোপ ছড়িয়ে পড়ে। গ্রামের প্রায় পঞ্চাশ জনেরও বেশি মানুষ আক্রান্ত হন এই রোগে। খবর পেয়ে তড়িঘড়ি গ্রামে পাঠানো হয় মেডিক্যাল টিম। ব্লক প্রশাসন ও ব্লক স্বাস্থ্য দফতরের আধিকারিক থেকে শুরু করে জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক পর্যন্ত গ্রামে ছুটে যান। কিন্তু ডায়রিয়া ছড়িয়ে পড়ার কারণ খুঁজতে গিয়ে জেলার স্বাস্থ্য কর্তারাই রীতিমতো হতবাক হয়ে যান। তাঁদের দাবি, ওই গ্রামে ৭০ শতাংশ বাড়িতেই শৌচালয় নেই!
গ্রামের মানুষ বাধ্য হয়ে স্থানীয় একটি পুকুরের জল ব্যবহার করেন। আর সেই পুকুরেই মিশছে নোংরা আবর্জনা যুক্ত নিকাশি নালার জল, যা জলবাহিত রোগের এক প্রধান উৎস। স্বাস্থ্য দফতর এই তথ্য প্রকাশ করতেই তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।
নির্মল ঘোষণা বনাম বাস্তবতা:
বাঁকুড়া জেলাকে যখন ‘নির্মল জেলা’ হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছিল, তখন দুর্লভপুর গ্রামের নামও ছিল ‘নির্মল গ্রামের’ তালিকায়। সেই হিসাবে গ্রামের প্রতিটি পরিবারেই শৌচালয় থাকার কথা। কিন্তু সরকারি সেই তথ্য যে কতটা ‘জল মেশানো’ ছিল, দুর্লভপুর গ্রামের এই করুণ ছবি সেটাই নির্মমভাবে প্রমাণ করে দিয়েছে। বিরোধীরা প্রশ্ন তুলছেন, শুধু শৌচালয়ের ক্ষেত্রেই নয়, কেন্দ্র ও রাজ্যের হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে বাঁকুড়া জেলায় বহু জল প্রকল্প রূপায়নের পরেও দুর্লভপুর গ্রামের মানুষ কেন এখনও পুকুরের নোংরা জল ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন?
শাসক দলের সাফাই ও বিরোধীদের দাবি:
রাজ্যের শাসক দলও বিরোধীদের অভিযোগ কার্যত মেনে নিয়েছে। তবে তাঁদের দাবি, গ্রামের গরিব পরিবারগুলিতে যথেষ্ট জায়গা না মেলায় প্রত্যেক পরিবারে শৌচালয় তৈরি করা সম্ভব হয়নি। স্থানীয় গঙ্গাজলঘাটি পঞ্চায়েত সমিতির যুক্তি, এলাকার কমিউনিটি শৌচালয়ের নিরিখেই গ্রামটিকে ‘নির্মল’ ঘোষণা করা হয়েছিল। পানীয় জল নিয়ে পঞ্চায়েত সমিতির যুক্তি হলো, নলবাহিত পানীয় জল প্রকল্পের কাজ চলছে এবং দ্রুত নলবাহিত জল ওই গ্রামে পৌঁছে যাবে।
বাঁকুড়া জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক শ্যামল সোরেন পরিস্থিতি স্বীকার করে বলেন, “৯৬২টি বসতি। পুকুরের জল ব্যবহার করছে। চারদিকের নোংরা জল ঢুকছে, তাতেই বাসন মাজা চলছে, তাতেই খাওয়াদাওয়া। আমরা সাবধান করেছি। আমরা দেখলাম ৭০ শতাংশ বাড়িতেই শৌচালয় নেই।” দুর্লভপুরের এই ঘটনা সমগ্র জেলার জনস্বাস্থ্যের আসল চিত্র তুলে ধরেছে বলে দাবি বিরোধীদের।