কর্মসংস্থান বিতর্কে উত্তাল বাংলা, নীতি আয়োগের সাফল্যের দাবি বনাম বিরোধীদের ‘চাকরি চুরি’র অভিযোগ

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সম্প্রতি নীতি আয়োগের একটি প্রতিবেদনের উল্লেখ করে রাজ্যের কর্মসংস্থান ও সামাজিক-অর্থনৈতিক সূচকে উল্লেখযোগ্য সাফল্যের দাবি করেছেন। তিনি তাঁর এক্স হ্যান্ডেলে লিখেছেন, “নীতি আয়োগ আনুষ্ঠানিকভাবে পশ্চিমবঙ্গের কর্মসংস্থানসহ বিভিন্ন সামাজিক-অর্থনৈতিক সূচকে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের স্বীকৃতি দিয়েছে।” মুখ্যমন্ত্রীর এই দাবি রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
নীতি আয়োগের প্রতিবেদনে বাংলার সাফল্য:
নীতি আয়োগের সাম্প্রতিক ‘সামারি রিপোর্ট ফর দি স্টেট অব ওয়েস্ট বেঙ্গল’ (২০২২-২৩) অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের বেশ কিছু সূচক জাতীয় গড়ের তুলনায় ভালো অবস্থানে রয়েছে:
বার্ষিক বেকারত্বের হার: মাত্র ২.২%, যা জাতীয় গড় ৩.২%-এর তুলনায় ৩০% কম।
সাক্ষরতার হার: ৭৬.৩% (জাতীয় গড় ৭৩%)।
গড় আয়ু: ৭২.৩ বছর।
লিঙ্গানুপাত: ৯৭৩ (জাতীয় গড় ৮৮৯)।
শিশু মৃত্যুহার: ১৯ (প্রতি ১,০০০ জন্মে)।
মোট উর্বরতার হার: ১.৬ (জাতীয় গড়ের চেয়ে কম)।
এছাড়া, শিক্ষাক্ষেত্রেও বাংলা এগিয়ে, কারণ এখানে স্কুল ছাড়ের হার কম এবং দশম ও দ্বাদশ শ্রেণির পাসের হার জাতীয় গড়ের চেয়ে বেশি। পানীয় জলের প্রাপ্যতা সহ গুণগত জীবনযাত্রার সূচকেও রাজ্য অগ্রগতি দেখিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী তাঁর পোস্টে দাবি করেছেন, “এই অর্জনগুলি পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি প্রতিফলিত করে,” এবং এই সাফল্যকে তৃণমূল সরকারের নেতৃত্বের ফল হিসেবে তুলে ধরেন।
বিরোধীদের তীব্র কটাক্ষ: ‘যদি এত কর্মসংস্থান হয়, তবে কেন পরিযায়ী শ্রমিক?’
মুখ্যমন্ত্রীর এই দাবির প্রতিক্রিয়ায় বিরোধী দল, বিশেষত ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি), তীব্র কটাক্ষ করে প্রশ্ন তুলেছে। বিজেপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, “যদি বাংলায় এত কর্মসংস্থান হয়, তবে কেন হাজার হাজার তরুণ প্রতিভা অন্য রাজ্যে চাকরির জন্য পাড়ি দিচ্ছে? কেন এত বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিক ভিন রাজ্যে?”
বিরোধীরা আরও অভিযোগ করেছে, তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের আমলে ‘চাকরি চুরি’র ঘটনা বেড়েছে, যার ফলে প্রায় ২৬,০০০ শিক্ষক আজ রাস্তায় আন্দোলন করছেন। তারা প্রশ্ন তুলেছে, নীতি আয়োগের প্রতিবেদনে বাংলার বেকারত্ব কম বলা হলেও বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। লক্ষ লক্ষ তরুণ গুজরাট, মহারাষ্ট্র, দিল্লির মতো রাজ্যে চাকরির জন্য যাচ্ছেন, এবং বাংলার পরিযায়ী শ্রমিকরা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও ভবিষ্যৎ প্রভাব:
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নীতি আয়োগের এই প্রতিবেদন বাংলার উন্নয়নের ইতিবাচক দিক তুলে ধরলেও, চাকরি কেলেঙ্কারি এবং পরিযায়ী শ্রমিকদের ইস্যু রাজ্য সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বিরোধীদের অভিযোগ, তথ্যের সঠিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুললেও, এই প্রতিবেদন তৃণমূলের জন্য রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক। তবে, চাকরিহারা শিক্ষকদের চলমান আন্দোলন এবং তরুণদের অন্য রাজ্যে পাড়ি দেওয়ার প্রবণতা রাজ্যের কর্মসংস্থানের দাবির বিপরীতে প্রশ্ন তুলছে। এই বিতর্ক আগামী দিনে রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।