বিচার না মেলায় ছেলের দেহ আগলে বাবা, মালদহে অষ্টম শ্রেণির ছাত্রের রহস্যমৃত্যু ঘিরে চরম উত্তেজনা

মালদহের ভূতনি থানার হিরানন্দপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের কেদারটোলা গ্রামে এক মর্মান্তিক ও চাঞ্চল্যকর ঘটনায় রাজ্যজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। মৃত্যুর ১২ দিন পেরিয়ে গেলেও অষ্টম শ্রেণির এক ছাত্রের দেহ সৎকার না করে, ন্যায়বিচারের দাবিতে সেটি আগলে রেখেছেন তাঁর বাবা। গ্রামবাসীরাও গ্রামের ক্লাব ঘরে দিনরাত পাহারা দিচ্ছেন এই দেহ, এবং পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন। অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেফতারের দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠেছে গোটা গ্রাম।
ঘটনার সূত্রপাত গত ২ জুলাই রাতে, যখন মানিকচকের রোজমেরি মিশনারি স্কুলের হোস্টেল থেকে শ্রীকান্ত মণ্ডল নামে অষ্টম শ্রেণির ওই ছাত্রের ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার হয়। স্কুল কর্তৃপক্ষ এটিকে আত্মহত্যা বলে দাবি করলেও, পরিবারের সদস্যরা ও গ্রামবাসীরা এই যুক্তি মানতে নারাজ। তাঁদের অভিযোগ, এটি একটি রহস্যজনক মৃত্যু এবং শ্রীকান্তকে খুন করা হয়েছে।
মৃত ছাত্রের বাবা প্রেম কুমার মণ্ডল পুলিশের কাছে প্রধান শিক্ষক সাজির হোসেন-সহ স্কুলের কয়েকজনের বিরুদ্ধে অত্যাচারের অভিযোগ এনেছিলেন। তাঁর দাবি, স্কুলের শিক্ষকদের অত্যাচারে তাঁর ছেলের মৃত্যু হয়েছে। প্রেম কুমার মণ্ডল দৃঢ়ভাবে বলছেন, “আমার ছেলে আত্মহত্যা করতে পারে না, ছেলেকে মেরে ফেলা হয়েছে।” যদিও অভিযোগ দায়েরের পরেও পুলিশ এখনও পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করেনি, যা গ্রামবাসীদের ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢেলেছে।
এই পরিস্থিতিতেই প্রেম কুমার মণ্ডল এক অভাবনীয় সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, যতক্ষণ না অভিযুক্তদের গ্রেফতার করা হচ্ছে এবং তাঁর ছেলের মৃত্যুর প্রকৃত বিচার মিলছে, ততক্ষণ তিনি ছেলের দেহ সৎকার করবেন না। গত ১২ দিন ধরে পরিবার ও গ্রামবাসীদের সহযোগিতায় স্থানীয় একটি ক্লাবের ফ্রিজে বরফ দিয়ে মৃতদেহ সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে।
ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্টে আত্মহত্যা বলা হয়েছে, কিন্তু মৃত ছাত্রের পরিবার এবং গ্রামবাসীরা সেই রিপোর্ট মানতে নারাজ। তাঁরা দ্বিতীয়বার ময়নাতদন্তের দাবি তুলেছেন। পাশাপাশি, সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখারও দাবি জানানো হয়েছে, যা ঘটনার সত্যতা উন্মোচনে সহায়ক হতে পারে।
ন্যায়বিচারের দাবিতে মৃত ছাত্রের পরিবার কলকাতা হাইকোর্টেরও দ্বারস্থ হয়েছে। প্রেম কুমার মণ্ডল জানিয়েছেন, তাঁরা ইতিমধ্যেই হাইকোর্টের আইনজীবীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন এবং মামলা দায়ের করা হয়েছে।
গ্রামের বাসিন্দারা ঐক্যবদ্ধভাবে দিনরাত এক করে দেহ পাহারা দিচ্ছেন এবং অভিযুক্তদের গ্রেফতারের দাবিতে লাগাতার বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছেন। এই ঘটনা মালদহের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র সুরক্ষার বিষয়টি নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। সকলের চোখ এখন আদালতের সিদ্ধান্তের দিকে, যা এই রহস্যজনক মৃত্যুর পেছনে থাকা সত্যকে সামনে আনতে পারে।