ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াইতে থিয়েটারের শক্তি, চন্দন সেনের ‘রঙ্গ ব্যঙ্গ’ মঞ্চস্থ

ক্যানসার মানেই কি হেরে যাওয়া? এই প্রশ্নকে মিথ্যে প্রমাণ করে জীবনের মঞ্চে নতুন করে আলোর দিশা দেখাচ্ছেন ক্যানসারজয়ীরা। আর এই লড়াইয়ে তাঁদের অন্যতম পথপ্রদর্শক নাট্যকর্মী ও অভিনেতা চন্দন সেন। নিজে মারণ রোগকে জয় করে সুস্থ জীবনে ফিরে আসার পর, এবার তিনি ক্যানসারজয়ীদের নিয়েই মঞ্চস্থ করলেন এক অভিনব নাটক – ‘রঙ্গ ব্যঙ্গ’। এই উদ্যোগ শুধু শিল্পচর্চাই নয়, ক্যানসার সম্পর্কে প্রচলিত ভুল ধারণা ভাঙা এবং আক্রান্তদের মানসিক শক্তি জোগানোর এক অনন্য প্রয়াস।
শনিবার সন্ধ্যায় কলকাতার কলা মন্দিরে একটি বেসরকারি হাসপাতালের উদ্যোগে মঞ্চস্থ হয় ‘রঙ্গ ব্যঙ্গ’। এই নাটকে অশোকনগর নাট্যনয়নের কলাকুশলীদের পাশাপাশি মূল ভূমিকায় অভিনয় করেছেন বেশ কয়েকজন ক্যানসারজয়ী। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের মন্ত্রী শশী পাঁজা, বিধায়ক দেবাশিস কুমার, প্রাক্তন মুখ্যসচিব আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়, স্বাস্থ্য অধিকর্তা স্বপন সোরেন এবং পরিচালক নন্দিতা রায়, যা এই উদ্যোগের গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে তোলে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পাঁচটি ক্ষুদ্র নাট্য অবলম্বনে নির্মিত এই ‘রঙ্গ ব্যঙ্গ’-এর নির্দেশনা দিয়েছেন চন্দন সেন নিজেই। নাটকগুলিতে ছিল ‘আর্য ও অনার্য’, ‘অন্ত্যেষ্টি সৎকার’, ‘নতুন অবতার’, ‘অরসিকের স্বর্গপ্রাপ্তি’ এবং ‘স্বর্গীয় প্রহসন’। হাস্যরস এবং ব্যঙ্গের মোড়কে সমাজের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে ক্যানসারজয়ীরা নিজেদের অভিজ্ঞতাকে শিল্পের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন।
নির্দেশক চন্দন সেনের ভাবনা:
নাট্যনির্দেশক চন্দন সেন এই নাটক মঞ্চস্থ করার পেছনের ভাবনা ব্যাখ্যা করে বলেন, “সাধারণত ক্যানসার আক্রান্তরা প্রচণ্ড অবহেলিত এবং অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়েন। তাই এই ধরনের অনুষ্ঠানে তারা বাঁচার রসদ পান। সেই কারণেই এই ভাবনা। পরবর্তীকালে জেলায় জেলায় গিয়ে এই ধরনের অনুষ্ঠান করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে আমাদের ক্যানসার নিয়ে সচেতনতার অভাব রয়েছে। সেটাই মূল সমস্যা। নয়তো এই রোগকে জয় করা সম্ভব।” তাঁর কথায়, শিল্প মানুষের মনকে চাঙা করে তোলে, এবং ক্যানসারের মতো কঠিন রোগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এটি এক শক্তিশালী অস্ত্র হতে পারে।
মঞ্চে ক্যানসারজয়ীদের কণ্ঠস্বর:
শিলিগুড়ির বাসিন্দা মৌসুমী বন্দ্যোপাধ্যায়, যিনি ২০০৫ সালে স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং বর্তমানে সম্পূর্ণ সুস্থ, তিনিও এই নাটকে অংশ নিয়েছিলেন। মঞ্চে অভিনয়ের অভিজ্ঞতা জানাতে গিয়ে মৌসুমী বলেন, “আমার মনেই হল না আমি এই প্রথমবার মঞ্চে উঠলাম। সবাই অত্যন্ত দায়িত্ব সহকারে আমাদের তৈরি করেছেন। এখন আমি সম্পূর্ণ সুস্থ। জীবনটা থেমে যেতে চাইছিল। কিন্তু সেটা আমরা হতে দিইনি। সবাইকে সেটা বুঝতে হবে। আমাদের জীবন যেমনটা ছিল ঠিক তেমনটাই আছে। আমাদের মনের জোর দিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।”
চিকিৎসকদের অভিমত:
অঙ্কোলজি বিভাগের অধ্যাপক চিকিৎসক সুবীর গঙ্গোপাধ্যায় এই ধরনের উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, “ক্যানসার আক্রান্ত মানুষটি সেই রোগটা জয় করছে। কিন্তু যে বৃহত্তর সমাজ থেকে সে আসছে, সেখানে সে এর জন্য লাঞ্ছনার শিকার হয়। ক্যানসার হলে সমাজে গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে একটা অসুবিধা থেকে যায়। সেখান থেকেই আমাদের এই পরিকল্পনা। যে মানুষটির ক্যানসার হয়েছিল সে রোগটা তার সেরে গিয়েছে। সেই রোগের জন্য হয়তো তার শারীরিক কিছু বিকৃতি হয়েছে। কিন্তু তাদের প্রতি একটি সহমর্মী মনোভাব এই বৃহত্তর সমাজ থেকে পাওয়া দরকার।”
‘রঙ্গ ব্যঙ্গ’ শুধু একটি নাট্যপ্রদর্শন নয়, এটি ক্যানসারের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং ক্যানসারজয়ীদের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনার এক সফল মঞ্চ। এই ধরনের উদ্যোগ সমাজে ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে দেবে এবং ক্যানসার আক্রান্তদের প্রতি সহানুভূতি ও সমর্থন বাড়াতে সাহায্য করবে বলে আশা করা হচ্ছে।