“পছন্দ ছিল না মেয়ের শর্টস পরা..”-নিহত রাধিকার মা-বাবাকে নিয়ে বিস্ফোরক বান্ধবী

টেনিস তারকা রাধিকা যাদব হত্যাকাণ্ড: পোশাক, স্বাধীনতা ও সামাজিক মাধ্যম নিয়ে পারিবারিক টানাপোড়েনই কি কাল হলো?
গুরুগ্রাম, হরিয়ানা: হরিয়ানার তরুণী টেনিস খেলোয়াড় রাধিকা যাদব হত্যাকাণ্ডের তদন্তে এবার সামনে আসছে তাঁর পারিবারিক জীবনের নানা দিক। অভিযোগ উঠেছে, মেয়ের ছোট পোশাক পরা বা কোনো ছেলের সঙ্গে কথা বলা একদমই পছন্দ করতেন না রাধিকার বাবা-মা। গত বৃহস্পতিবার গুরুগ্রামে নিজের বাড়িতেই বাবার হাতে খুন হন রাধিকা। এই চাঞ্চল্যকর তথ্যাদি উঠে এসেছে রাধিকার বন্ধু হিমাংশিকা সিং রাজপুতের ইনস্টাগ্রাম পোস্টে এবং পুলিশের তদন্তে।

বন্ধুর বিস্ফোরক দাবি: ‘পরিবারের কড়া নিয়ন্ত্রণই রাধিকার জীবন কেড়ে নিল’
রাধিকার বন্ধু হিমাংশিকা, যিনি নিজেও একজন টেনিস খেলোয়াড়, শনিবার একটি ভিডিও বার্তায় রাধিকার পারিবারিক জীবন নিয়ে বিস্ফোরক দাবি করেছেন। তাঁর অভিযোগ, রাধিকাকে সব সময় তাঁর বাবা-মা ‘নিয়ন্ত্রণ’ করতেন। মেয়ের ছোট পোশাক পরা, পুরুষ বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলা নিয়ে তাঁদের আপত্তি ছিল। এমনকি রাধিকার বাড়ি থেকে বেরোনো এবং বাড়ি ফেরার সময়ও বেঁধে দেওয়া হয়েছিল।

হিমাংশিকা দাবি করেন, রাধিকা অত্যন্ত কর্মঠ এবং নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য কঠোর পরিশ্রম করতেন। কিন্তু তাঁর স্বাবলম্বী হওয়া বাড়ির লোকেরা মেনে নিতে পারতেন না। হিমাংশিকা জানান, ২০১২-১৩ সাল নাগাদ তাঁরা একসঙ্গে টেনিস খেলা শুরু করেন এবং বহু ম্যাচ খেলেছেন। রাধিকা খুবই চুপচাপ স্বভাবের ছিলেন এবং কারও সঙ্গে বিশেষ কথা বলতেন না।

প্রতিটি পদক্ষেপের ওপর নজরদারি ও শখ বিসর্জন
হিমাংশিকার ভিডিওতে রাধিকার বাড়ির পরিবেশ প্রসঙ্গে তিনি দাবি করেন, রাধিকাকে প্রতিটি পদক্ষেপের জন্য বাড়িতে জবাবদিহি করতে হতো। কাঁধে চোট লাগার কারণে খেলা থেকে বিরতি নিয়ে রাধিকা বাচ্চাদের জন্য একটি টেনিস অ্যাকাডেমি খুলেছিলেন, যা তাঁদের বাড়ি থেকে মাত্র ৫০ মিটার দূরে ছিল। হিমাংশিকার অভিযোগ, অ্যাকাডেমি থেকে নির্ধারিত সময়ের সামান্য পরে ফিরলেও রাধিকাকে বাড়িতে কথা শুনতে হতো। ভিডিও কলে কথা বলার সময়ও পরিবারের লোক বার বার এসে দেখতেন কার সঙ্গে রাধিকা কথা বলছেন। রাধিকার বাড়িতে নিজের কোনো স্বাধীনতা ছিল না। ছবি তোলা এবং রিলস (Reels) বানানোর শখ ছিল রাধিকার, কিন্তু বাড়ির লোকের চাপে তিনি সেসবও বন্ধ করে দেন।

‘লাভ জিহাদ’ তত্ত্ব খারিজ: পুলিশ হেফাজতে বাবা
রাধিকার মৃত্যুর পর ‘লাভ-জিহাদ’-এর তত্ত্ব সামনে এলেও হিমাংশিকা সেই সম্ভাবনা উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন, রাধিকা পরিবারের চাপে নিজেকে গুটিয়ে রাখতেন, ফলে কারও সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হওয়ার অবকাশই ছিল না। পুলিশও ‘লাভ জিহাদ’-এর বিষয়টি মান্যতা দেয়নি।

পুলিশ জানিয়েছে, বাবা দীপক রাধিকাকে লক্ষ্য করে পাঁচটি গুলি করেছিলেন, যার মধ্যে চারটি গুলি রাধিকার দেহে লাগে। আপাতত দীপক পুলিশ হেফাজতে রয়েছেন। পুলিশ রাধিকার বাড়ি থেকে ব্যবহৃত আগ্নেয়াস্ত্র এবং বেশ কিছু গুলি উদ্ধার করেছে। দীপকের ভাই বিজয় যাদব জানিয়েছেন, দীপক নিজেও মেয়েকে খুন করার কথা স্বীকার করেছেন।

সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার হওয়ার আকাঙ্ক্ষা ও পারিবারিক অশান্তি
পুলিশ সূত্রে খবর, কোচ অজয় যাদবের সঙ্গে রাধিকার একটি হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট তদন্তকারীদের হাতে এসেছে। সেই চ্যাটে রাধিকা নিজের বাড়ি ছেড়ে বিদেশে চলে যাওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। পুলিশের এক আধিকারিক জানান, কাঁধে চোট লাগার পর নিজের পেশা পরিবর্তন করে সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার হওয়ার কথা ভাবছিলেন তিনি। এই নতুন পেশার আকাঙ্ক্ষা এবং পারিবারিক বিধিনিষেধের মধ্যে যে সংঘাত চলছিল, সেটাই এই হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

রাধিকার মৃত্যু আবারও সমাজে নারী স্বাধীনতা, পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ এবং মানসিকতার প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে, যা গভীরভাবে সমাজের বিভিন্ন স্তরে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।