“এমন ভাবে FIR লিখুন, যাতে আমার ফাঁসিই হয়”-মেয়েকে খুন করে অনুশোচনায় রাধিকার বাবা!

টেনিস খেলোয়াড় রাধিকা যাদব খুনের ঘটনায় নতুন মোড়! অভিযুক্ত বাবা দীপক যাদব নাকি নিজেই ফাঁসির সাজা চেয়েছেন। শনিবার মিডিয়ার সামনে এমন চাঞ্চল্যকর দাবি করেছেন রাধিকার জেঠু, ৫৪ বছর বয়সী বিজয় যাদব। এই ঘটনায় একদিকে যেমন দীপকের মানসিক অবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, তেমনই তদন্তের জালে জড়িয়ে পড়ছেন রাধিকার মা মঞ্জু যাদবও।

গুরুগ্রামের সুশান্ত লোক এলাকায় বাবা-মা ও ভাইয়ের সঙ্গে থাকতেন ২৫ বছর বয়সী টেনিস প্লেয়ার রাধিকা। গত বৃহস্পতিবার তিনি নিজের বাড়িতেই খুন হন। গুলিবিদ্ধ রাধিকাকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন তাঁর কাকা কুলদীপ যাদব, যিনি একই বাড়িতে থাকতেন। পরে পুলিশ অভিযুক্ত সন্দেহে বাড়ি থেকেই রাধিকার বাবা দীপককে গ্রেফতার করে। খুনে ব্যবহৃত .৩২ বোরের রিভলভারও উদ্ধার হয়েছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট অনুযায়ী, রাধিকাকে চারটি গুলি করা হয়েছিল। পুলিশের কাছে দীপক নিজেও খুনের কথা স্বীকার করেছেন।

শনিবার মিডিয়ার সামনে রাধিকার জেঠু বিজয় যাদব বলেন, “যা ঘটেছে, সেটা নিঃসন্দেহে অন্যায়। তবে কাল যখন দীপককে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়, আমিও সঙ্গে ছিলাম। ও পুলিশকে বলেছে, এমন ভাবে এফআইআর লিখুন, যাতে আমার ফাঁসিই হয়। মেয়েকে খুন করার জন্য ওর মনে খুবই অনুশোচনা রয়েছে।” শনিবার দীপককে ২ সপ্তাহের বিচারবিভাগীয় হেফাজতে পাঠানো হয়েছে।

পুলিশের কাছে দীপক দাবি করেছে, ওয়াজ়িরাবাদে তাদের গ্রামের বাড়িতে থাকার সময়ে পড়শিরা নাকি প্রায়ই ‘মেয়ের টাকায় বসে খাচ্ছ’ বলে তাকে কটাক্ষ করত। সেই রাগেই সে মেয়েকে ট্রেনিং ও কোচিং বন্ধ করতে বলেছিল। মেয়ে না শোনায়, রাগ করেই সে মেয়েকে খুন করেছে।

তবে, পুলিশ এই যুক্তিকে পুরোপুরি মান্যতা দিচ্ছে না। কারণ, বাড়ি ও ফার্ম হাউস ভাড়া দিয়ে যার মাসে আয় ১৫-১৭ লক্ষ টাকা, তাকে ‘মেয়ের টাকায় বসে খাচ্ছ…’ বলে পড়শিদের কটাক্ষ করা খুব স্বাভাবিক বলে মনে করছে না পুলিশ। এছাড়া, পড়শিদের কটাক্ষের কোনো প্রমাণও পুলিশ পায়নি।

রাধিকার মায়ের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
এই প্রসঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে রাধিকার মা মঞ্জু যাদবের ভূমিকাও। রাধিকার মা মঞ্জু প্রথমে পুলিশের কাছে বয়ান রেকর্ড করাতে চাননি, পরে অবশ্য সেটা করেন। মঞ্জুর দাবি, তিনি জ্বরে ভুগছিলেন, তাই ঘরে শুয়েছিলেন। গুলির শব্দ শুনে ছুটে আসেন। তবে স্বামীই খুন করেছে কি না বা কেন করেছে, সে ব্যাপারে কিছুই জানেন না বলে দাবি মঞ্জুর। রাধিকার ভাইকে তাঁর বাবা দীপক ইচ্ছে করেই ঘটনার সময়ে দুধ কিনতে বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছিল বলেও দাবি।

গুরুগ্রাম পুলিশের পিআরও সন্দীপ কুমার বলেন, “অভিযুক্ত দীপকের কথায় অনেক ফাঁক রয়েছে। মেয়েকে খুনের ব্যাপারে স্ত্রীকে আগাম কিছু জানিয়েছিল কি না, সেটা আমরা খতিয়ে দেখছি। রাধিকার মা খুনের ব্যাপারে জানতেন, এই সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।”

পারিবারিক কলহ ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা
রাধিকার জেঠুর বক্তব্য, “শান্তিপূর্ণ পরিবারই ছিল, কী হলো, বুঝতেই পারছি না। আমার মনে হয়, রাগের মাথায় এই সিদ্ধান্ত নিলেও মনোকষ্টে ভুগছিল দীপক, তাই সামনা-সামনি মেয়ের চোখে চোখ রেখে গুলি করতে পারেনি।”

প্রাথমিকভাবে শোনা গিয়েছিল, রাধিকা নিজস্ব টেনিস অ্যাকাডেমি খুলেছিলেন, যার জন্য ২ কোটি টাকা সাহায্য করেছিল দীপক। কিন্তু শনিবার তদন্তকারী অফিসার সংবাদ সংস্থা পিটিআই-কে জানান, “রাধিকার নিজস্ব কোনো অ্যাকাডেমি ছিল না। বিভিন্ন জায়গায় টেনিস কোর্ট ভাড়া নিয়ে উঠতি টেনিস তারকাদের প্রশিক্ষণ দিতেন তিনি। দীপক এটাই পছন্দ করত না, বার বার রাধিকাকে ট্রেনিং বন্ধ করতে বলেছিল। এটাই বাবা-মেয়ের অশান্তির মূল কারণ।”

বাড়িতে যে আপত্তি এবং কড়াকড়ি ছিল, সেটা স্পষ্ট কোচ অজয় যাদবের সঙ্গে রাধিকার একটি হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাটেও। শনিবার প্রকাশ্যে আসা সেই চ্যাটে রাধিকা তাঁর কোচকে জানিয়েছিলেন, একটু স্বাধীনভাবে বাঁচার জন্য অক্টোবর, নভেম্বর এবং ডিসেম্বর— এই তিনটে মাস বাড়ি থেকে একটু দূরে থাকতে চান তিনি। কবেকার এই কথোপকথন, সেটা স্পষ্ট নয়। তবে রাধিকার বক্তব্য, “বাড়িতে খুব বাধা-নিষেধ, একটু স্বাধীনভাবে বাঁচতে চাই।”

রাধিকার অন্য এক কোচের অবশ্য বক্তব্য, “মেয়েটাকে ১১-১২ বছর বয়স থেকে চিনি। ওর বাবাকেও চিনি। বাবা-মেয়ের বন্ডিং ভালোই ছিল, কখনও অস্বাভাবিক কিছু চোখে পড়েনি। টেনিস প্র্যাকটিসে মেয়েকে উৎসাহই দিতেন দীপক। হঠাৎ কী হলো, বুঝতে পারছি না।”

দীপকের এই দু’রকম আচরণই ভাবাচ্ছে তদন্তকারীদের। তবে ভিন্‌ধর্মের কারও সঙ্গে প্রেমের কারণে খুনের দাবি উড়িয়ে দিচ্ছেন রাধিকার জেঠু বিজয়। তাঁর বক্তব্য, “আমাদের পরিবার অশিক্ষিত নয়। ভিন্‌ধর্মের হলেও বিয়ে দিতে আমাদের কোনো সমস্যা ছিল না। তার জন্য বাড়ির মেয়েকে কেউ খুন করবে না।”