‘মার্ডারবাদ’ আসছে ১৮ জুলাই, বাঙালি পরিচালকের বলিউড স্বপ্ন ও ইন্ডাস্ট্রির কন্টকাকীর্ণ পথ

বাঙালি তরুণ অর্ণব চট্টোপাধ্যায়ের হাতে তৈরি হিন্দি থ্রিলার ‘মার্ডারবাদ’ মুক্তি পেতে চলেছে আগামী ১৮ জুলাই। এই ছবির ট্রেলার ইতিমধ্যেই দর্শকদের মধ্যে কৌতূহল জাগিয়েছে। শুধুমাত্র পরিচালনা, প্রযোজনা, গল্প, চিত্রনাট্য আর সংলাপই নয়, অর্ণব নিজেই এই ছবিকে স্বাধীনভাবে তৈরি করার কঠিন পথ বেছে নিয়েছেন। ইটিভি ভারতে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ছবির অভিনেতা মাসুদ আখতার (যিনি ছবিতে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে আছেন) প্রথম এই খবর জানান।

আট বছরের স্বপ্নপূরণ:

অর্ণব চট্টোপাধ্যায় জানান, মাত্র আট বছর বয়স থেকেই তিনি শর্ট ফিল্ম বানানো শুরু করেন, যদিও তা ছিল অত্যন্ত ছোট পরিসরে। এরপর ২০১৬-১৭ সালে বন্ধুদের নিয়ে একটি ফিচার ফিল্ম ‘আনসেইড’ তৈরি করেন। জি ফাইভের জন্য ‘জন্মদিন’ নামের একটি ছবি বানানোর পর তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য লন্ডন পাড়ি দেন। ২০২২ সালে মুম্বই ফিরে আসার পর কোভিডকালে লেখা ‘মার্ডারবাদ’ (আগের নাম ‘মুর্দাবাদ’)-এর গল্প নিয়ে কাজ শুরু করেন।

বাংলাতে ছবি না বানিয়ে হিন্দিতে কেন? এই প্রশ্নের উত্তরে অর্ণব বলেন, “শুরু থেকেই হিন্দিতে বানানোর ইচ্ছা ছিল। কলকাতায় দু-একজনের সঙ্গে বাংলায় ছবিটা করার কথা বললেও শেষ পর্যন্ত তা ফলপ্রসূ হয়নি। মুম্বইতে নিজের অফিস সেটআপ করে নিজেই প্রযোজনা করার সিদ্ধান্ত নিই, কারণ এর মাঝে যাদের সঙ্গে প্রযোজনা নিয়ে কথা হচ্ছিল, তাদের সঙ্গে আমার ‘মনের আর মতের মিল’ হচ্ছিল না। ছবির স্কেল, কাস্টিং সবকিছু নিয়ে মতের অমিল হতে থাকে।” গত বছর মে মাস থেকে নভেম্বর পর্যন্ত টানা শুটিং শেষে এখন ছবি মুক্তির পালা। মুম্বই, রাজস্থান, এবং উত্তরবঙ্গের চালসা, জলপাইগুড়িতে হয়েছে এই ছবির শুটিং। ছবির মুখ্য চরিত্র উত্তরবঙ্গের এক ছেলে, যে রাজস্থানের জয়পুরে ট্যুর গাইড হিসেবে চাকরি পায় এবং এরপর নানান ঘটনার জালে জড়িয়ে পড়ে।

কলকাতার ইন্ডাস্ট্রির ‘তিক্ত অভিজ্ঞতা’:

‘মার্ডারবাদ’-এ বরুণ চন্দ্র, কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়, সুব্রত দত্তের মতো বহু বাঙালি অভিনেতা ছাড়াও মাসুদ আখতার, কণিকা কাপুর, নকুল রোশন সহদেব, মনীশ চৌধুরী, রবিনা শর্মার মতো অভিনেতারা রয়েছেন। অর্ণব বাংলাতেও ছবি বানাতে ইচ্ছুক, কিন্তু তাঁর মুম্বইতে বসে স্পষ্ট বক্তব্য, “কলকাতার ইন্ডাস্ট্রিতে অনেক গণ্ডগোল আছে।” ‘জন্মদিন’ তৈরির সময়ের তিক্ত অভিজ্ঞতা স্মরণ করে অর্ণব জানান, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় নাকি তাঁকে নিজে বাংলায় ছবি বানাতে বারণ করেছিলেন।

উত্তরবঙ্গে শুটিং করতে গিয়েও তিনি ইউনিয়নের সঙ্গে সমস্যায় পড়েছেন। পরিচালকের কথায়, “অতিরিক্ত লোক নিয়ে কাজ করা সহ নানারকম সমস্যায় ভুগেছি। তাই সাতদিনের শুটের জায়গায় চারদিন করে গুটিয়ে নিতে হয়েছিল।” তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “কলকাতার ইন্ডাস্ট্রি ভাবে হিন্দি ছবি মানেই ‘যশ রাজ’ আর ‘ধর্মা’। কেউ ভাবতেই পারে না কোনও বাঙালি ছেলেও কম বাজেটে হিন্দি ছবি বানানোর চেষ্টা করতে পারে। উলটে ফেডারেশনের এমন মনোভাব যে পঁচিশ বছর বয়সী বাঙালি ছেলে হিন্দিতে ছবি বানাচ্ছে মানে তার থেকে যা পারো কেটে বের করে নাও। হিন্দি ছবি মানেই ভাবে ৫০ কোটি-১০০ কোটি।” এই সব কাটিয়ে উঠে অর্ণব মুম্বইতেই তাঁর স্বপ্নের কাজটা সম্পন্ন করেন। তিনি বিশ্বাস করেন, বাংলায় অনেক ভালো ছবি হয়, কিন্তু সেখানকার সমস্যার জন্য অনেককিছুতে বাধা পড়ে যাচ্ছে। তবে তিনি বলিউডের বড় অনুরাগী।

নিজের শর্তে সিনেমা:

অর্ণব আরও জানান, এক প্রযোজনা সংস্থার কর্ণধারের বন্ধু তাঁকে হিন্দি ছবি বানানোর প্রস্তাব দিয়েছিল। জয়দীপ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে ওই প্রযোজনা সংস্থায় মিটিংও হয়, কিন্তু তারা ‘মার্ডারবাদ’কে ওয়েব সিরিজ বানাতে বলে, যা অর্ণব প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি যে স্কেলে ছবিটি দেখাতে চেয়েছিলেন, তা ওটিটিতে মুক্তি দিতে চাননি।

১৮ জুলাই মুক্তি পেতে চলা ‘মার্ডারবাদ’ সিনেমাস্কোপে এবং সম্পূর্ণ সিনেমা স্টাইলে শুটিং হয়েছে। অর্ণবের কথায়, “ভারতে কোনও ইন্ডাস্ট্রি ব্যাকিং বা স্টুডিও সাপোর্ট ছাড়া দেশ জুড়ে ছবি রিলিজ করানো বেশ কঠিন। কিন্তু আমি ভাবলাম যা করব নিজেই করব।” আগামী পাঁচ বছর আরও ছবি বানাতে চান তিনি, আপাতত হিন্দিতেই কাজ করার ইচ্ছা। এই ছবিতে দুই শহরের অভিনেতাদের নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁর কাছে খুবই ভালো। তিনি বলেন, “তারা যেমন অভিজ্ঞ তেমনই ভালো মানুষ। আমি তৃপ্ত। ‘মার্ডারবাদ’ প্রকৃত অর্থে একটি স্বাধীন ছবি। আট-নয় বছরের স্বপ্ন এবার সফল হতে চলেছে। সর্বস্ব দিয়ে একা লড়ছি। তবে টিম আছে আমার পাশে। মুম্বইয়ের অনেকে বলেছেন, ‘মার্ডারবাদ’ মোস্ট কমার্শিয়াল ইন্ডিপেন্ডেন্ট ফিল্ম।”

ছবির ক্যামেরা সামলেছেন বিনোদ প্রধান। অ্যাকশন ডিরেক্টর ছিলেন শ্যাম কৌশল। রিকি মিউজিক ও ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর করেছেন। শান, নাকাশ আজিজ, অমিত কুমার গঙ্গোপাধ্যায়, অমিত মুখোপাধ্যায় গান গেয়েছেন, আর কুকু প্রভাস লিখেছেন গানের কথা।