“হাফিজ সইদ-মাসুদ আজহারকে প্রত্যর্পণে রাজি”-হঠাত্ সুর পাল্টে গেলো কেন পাকিস্তানের?

গত শনিবারের দাবি থেকে মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরে বিস্ফোরক মন্তব্য করলেন পাকিস্তানের প্রাক্তন বিদেশমন্ত্রী বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি (Bilawal Bhutto Zardari)। শনিবার তিনি দাবি করেছিলেন, কুখ্যাত জঙ্গি মাসুদ আজহার (Masood Azhar) পাকিস্তানে নয়, আফগানিস্তানে রয়েছে। কিন্তু রবিবার, আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি কার্যত স্বীকার করে নিলেন যে, হাফিজ সইদ (Hafiz Saeed) এবং মাসুদ আজহারের মতো জঙ্গিরা পাকিস্তানেই আশ্রিত এবং ভারত চাইলে তাদের প্রত্যর্পণ করতে পাকিস্তানের কোনো সমস্যা নেই। তার এই বক্তব্যে ঘুরপথে মোস্ট ওয়ান্টেড এই দুই জঙ্গির পাকিস্তানে অবাধ বিচরণের বিষয়টি আবারও সামনে চলে এল।
বিলাওয়ালের এই হঠাৎ ভোলবদল অবশ্য ভালোভাবে নেননি হাফিজ সইদের ছেলে তহা সইদ (Taha Saeed)। তার মতে, প্রাক্তন পাক বিদেশমন্ত্রীর এই মন্তব্য পাকিস্তানের সম্মান নষ্ট করেছে।
বিলাওয়ালের বিতর্কিত স্বীকারোক্তি:
আল জাজিরার সাংবাদিক যখন লস্কর-ই-তৈবা (Lashkar-e-Taiba) প্রধান হাফিজ সইদ এবং জইশ-ই-মহম্মদ (Jaish-e-Mohammed) প্রধান মাসুদ আজহারের প্রত্যর্পণের বিষয়ে প্রশ্ন করেন, তখন বিলাওয়াল ভুট্টো বলেন, “যে সমস্ত ব্যক্তিদের নিয়ে সমস্যা রয়েছে তাদের ভারতে প্রত্যর্পণ করতে কোনও সমস্যা নেই পাকিস্তানের। ভারত যদি চায় তাহলে এমনটা হতেই পারে।”
এটি তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এতদিন পাকিস্তান সরাসরি এই দুই জঙ্গির পাকিস্তানে উপস্থিতির কথা অস্বীকার করে আসছিল, বা তাদের সীমান্ত পেরিয়ে চলে যাওয়ার দাবি করত। বিলাওয়ালের এই মন্তব্য কার্যত তাদেরই আগের অবস্থানকে খারিজ করে দিল।
জঙ্গিদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের পদক্ষেপ ও বাস্তবতা:
লস্কর-ই-তৈবা এবং জইশ-ই-মহম্মদ— উভয় জঙ্গি সংগঠনকেই পাকিস্তান নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। হাফিজ সইদ ২৬/১১ মুম্বই সন্ত্রাসী হামলার মূল হোতা। বর্তমানে সে সন্ত্রাসে অর্থ জোগানোর অভিযোগে ৩৩ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছে। অন্যদিকে, রাষ্ট্রসংঘ স্বীকৃত সন্ত্রাসী মাসুদ আজহারকে পাকিস্তানের ন্যাশনাল কাউন্টার টেরোরিজম অথরিটি (NACTA) কর্তৃক নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
মাসুদ আজহার ভারতের অন্যতম মোস্ট ওয়ান্টেড সন্ত্রাসী এবং ভারতের বিরুদ্ধে একাধিক বড় সন্ত্রাসী হামলার সাথে জড়িত ছিল। এর মধ্যে রয়েছে ২০০১ সালের সংসদ হামলা, ২৬/১১ মুম্বই হামলা, ২০১৬ সালের পাঠানকোট এয়ারবেস হামলা এবং ২০১৯ সালের পুলওয়ামা আত্মঘাতী বোমা হামলা। ১৯৯৯ সালে কান্দাহার হাইজ্যাকের (ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্স ফ্লাইট ৮১৪ অপহরণ) পরিস্থিতিতে বন্দী মুক্তির বিনিময়ে তাকে ভারতের হেফাজত থেকে মুক্তি দেওয়া হয়।
তবে, হাফিজ সইদ এবং মাসুদ আজহার নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও পাকিস্তানের অভ্যন্তরে অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং নিজেদের সংগঠন নির্বিঘ্নে ও পাক সেনার সমর্থনে পরিচালনা করছে বলে বারবার অভিযোগ ওঠে।
তথাকথিত ‘সহযোগিতার অভাব’ নিয়ে বিলাওয়াল:
এই প্রসঙ্গে বিলাওয়াল বলেন, “এই ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যে মামলাগুলি রয়েছে, তা পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। হাফিজ সইদ ও মাসুদ আজহারকে সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদের জন্য বিচারের আওতায় আনা কঠিন, কারণ ভারতের তরফ থেকে তথাকথিত সহযোগিতার অভাব রয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “ভারত এমন কিছু মৌলিক শর্ত মানতে নারাজ, যা এদের দোষী সাব্যস্ত করার জন্য আবশ্যক। এই মামলাগুলিতে আদালতে প্রমাণ পেশ করতে হয়, ভারতের লোকজনকে এসে সাক্ষ্য দিতে হয়, এবং পাল্টা অভিযোগ মোকাবিলা করতে হয়। যদি ভারত এই প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করতে রাজি হয়, তাহলে কোনও ব্যক্তিকে প্রত্যর্পণ করতে কোনও বাধা থাকবে না।”
বিলাওয়ালের এই বক্তব্য ভারতের উপরই পাল্টা চাপ সৃষ্টির চেষ্টা বলে মনে করা হচ্ছে। তবে, পাকিস্তানের মাটি থেকে পরিচালিত জঙ্গি কার্যকলাপে তার দেশের ভূমিকা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে যে প্রশ্ন রয়েছে, তা বিলাওয়ালের এই নতুন মন্তব্যে আরও একবার স্পষ্ট হয়ে উঠল।