‘ম্যাজিক গাছ’-ই সারাচ্ছে ৬৫ রোগ? ভাইরাল দাবিতে গ্রামে মানুষের ভীড়, কি বলছে যুক্তিবাদী মঞ্চ?

একবিংশ শতাব্দীর এই বিজ্ঞান-নির্ভর যুগে যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের কণ্ঠস্বর নকল করছে এবং রোবট রেস্তোরাঁয় খাবার পরিবেশন করছে, ঠিক তখনই উত্তর ২৪ পরগনার গাইঘাটা থানার ময়না গ্রামে এক ‘ম্যাজিক গাছ’ ঘিরে শুরু হয়েছে চরম উন্মাদনা। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া এক দাবি অনুযায়ী, এই একটিমাত্র গাছ নাকি ৬৫টি দুরারোগ্য রোগের অব্যর্থ ওষুধ! এই অলৌকিক নিরাময়ের গুজবে কান দিয়ে এখন ময়না গ্রামে মানুষের ঢল নেমেছে, যা দেখে কার্যত ফুঁসে উঠেছেন বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী মঞ্চের সদস্যরা। তাদের স্পষ্ট দাবি, “এটা ম্যাজিক নয়, পুরোটাই বুজরুকি।” বনগাঁ সায়েন্স ক্লাবও এই বিষয়ে সচেতনতা প্রচারে নেমেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ময়না গ্রামের যুবক অপরূপ বৈদ্যই নাকি এই ‘ম্যাজিক গাছ’-এর খোঁজ পেয়েছিলেন, তাও আবার স্বপ্নে! গ্রামবাসীদের দাবি, অপরূপ স্বপ্নাদেশ পেয়েছিলেন যে, এই গাছ ব্যবহার করলেই নাকি সব রোগ ভ্যানিশ হয়ে যাবে। অপরূপের এই স্বপ্নের কথা দ্রুত লোকমুখে ছড়িয়ে পড়ে, আর এর পরেই ময়না গ্রামের ভাগ্য বদলে যায়। বর্তমানে প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ হাজার মানুষ এই গাছটির থেকে ‘ওষুধ’ সংগ্রহ করার জন্য ভিড় করছেন। মানুষের এই অস্বাভাবিক ভিড় এবং কোলাহলে স্থানীয় একটি স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে, আর স্থানীয়দের ঘুম উড়েছে।
এই ‘ম্যাজিক গাছ’-এর সুবাদে অপরূপ বৈদ্যের ভাগ্যও ‘টুকটাক’ বদলেছে। তিনি এখন দিনভর গাছের শিকড় দিয়ে মানুষকে ‘ওষুধ’ দিতে ব্যস্ত। এর বিনিময়ে বহু মানুষ ‘ভালোবেসে’ তাকে অর্থও দিচ্ছেন। যদিও তিনি নিজেকে ‘দাবিদাওয়াহীন’ বলেই পরিচয় দিতে পছন্দ করেন বলে লোকমুখে প্রচলিত।
অর্থ উপার্জনের নতুন কেন্দ্র:
‘ম্যাজিক গাছ’-কে কেন্দ্র করে এই বিপুল জনসমাগম দেখে এলাকায় ছোট-বড় দোকানও বসে গেছে। এতে অনেকেরই দু’চার পয়সা আয় হচ্ছে। শুক্রবার সেই গাছ থেকেই ‘ওষুধ’ নিতে আসা এক মহিলা বলেন, “আমার শাশুড়ি বাতের ব্যথায় কাবু। শুনেছি এই গাছ নাকি সব ব্যথার অব্যর্থ ওষুধ। তাই এসেছি।” ভিড়ে আসা প্রতিটি মানুষেরই আলাদা আলাদা কাহিনি, কিন্তু তাদের লক্ষ্য একটাই – অলৌকিকভাবে সমস্যার সমাধান। তাই তারা গাছের উপরেই ভরসা রাখছেন।
বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী মঞ্চের প্রতিবাদ:
মানুষের এই অন্ধ বিশ্বাস দেখে বহু যুক্তিবাদী মানুষ রীতিমতো হতবাক। বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী মঞ্চের রাজ্য সম্পাদক প্রদীপ সরকার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “মানুষকে বোকা বানানো হচ্ছে। তা হলে তো ডাক্তারদের দরকারই ছিল না? এখানেই আসুক সমস্ত রোগী।” তিনি আরও বলেন, “সোশ্যাল মিডিয়া দেখে অনেকে ছুটে আসছেন। টাকাও নষ্ট হচ্ছে। কিছুজন লোক ঠকিয়ে ব্যবসা করে যাচ্ছেন।”
এই ধরনের কুসংস্কারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে যুক্তিবাদী মঞ্চ পোস্টারের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে সচেতন করার জন্য ব্যাপক প্রচার চালাচ্ছে। পাশাপাশি, এই বিষয়টি গাইঘাটা থানায় মৌখিকভাবে জানানো হয়েছে সংশ্লিষ্ট সংগঠনের তরফে। বনগাঁ সায়েন্স ক্লাবও এই সচেতনতা প্রচারে যুক্ত হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, প্রশাসনের নাকের ডগায় কীভাবে এই ধরনের বুজরুকি চলছে এবং সাধারণ মানুষের বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে প্রতারণা করা হচ্ছে? এই ‘ম্যাজিক গাছ’ ঘিরে চলা উন্মাদনা কবে থামবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।