বঙ্গ বিজেপির নতুন চালচিত্র, সভাপতির পদে বসেই ‘হিন্দুত্ব’ ও ‘উন্নয়ন’-এর বার্তা শমীক ভট্টাচার্যের

রাজ্যে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের ডামাডোলের মধ্যেই রাজ্য বিজেপির কান্ডারি বদল হয়েছে। সায়েন্স সিটিতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে দলের রাজ্য সভাপতির গুরুদায়িত্ব গ্রহণ করেছেন শমীক ভট্টাচার্য। এই গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের পর বাংলার রাজনৈতিক মহলে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে – নবনিযুক্ত সভাপতির নেতৃত্বে বঙ্গ বিজেপির ভবিষ্যৎ রূপরেখা কী হবে? এই সব প্রশ্নের উত্তর জানতে আজ সকালে ইটিভি ভারত হাজির হয়েছিল সল্টলেকের বিএইচ ব্লকের ৬৬ নম্বর বাড়িতে, যেখানে শমীক ভট্টাচার্য এক একান্ত সাক্ষাৎকারে তাঁর ভাবনার কথা তুলে ধরেছেন।

দায়িত্ব গ্রহণ, তবুও ক্লান্তিহীন যোদ্ধা:

সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম দিনের অনুভূতি জানতে চাওয়া হলে শমীক ভট্টাচার্য বলেন, “৪২ বছর ধরে একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে কাজ করছি। এটাই আমার একমাত্র পরিচয়। ফলে এগুলো আমার কাছে ক্লান্তিও নয়, নতুন কিছুও নয়।” তিনি মনে করেন না, শুধু একটা পদে থাকলেই একজন মানুষ রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক হতে পারে। বরং মানুষের ছোট ছোট সমস্যা, যেমন স্কুলে ভর্তি, হাসপাতালের অ্যাডমিশন, বা মেয়ের বিয়ে – এসবের সঙ্গেই একজন রাজনৈতিক কর্মীর নিবিড় যোগাযোগ থাকে, আর এই কাজ তাঁর কাছে কখনও ক্লান্তিকর নয়।

‘হিন্দুত্ব’ মানে মৌলবাদ নয়, ‘বহুত্ববাদ’ই মূল শক্তি:

তাঁর সাম্প্রতিক ভাষণে ‘ইনক্লুসিভ পলিটিক্স’ (অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি)-এর উপর জোর দেওয়া প্রসঙ্গে শমীক ভট্টাচার্য জানান, “বিজেপিকে মানুষ যেভাবে উপস্থাপিত করে, আর বিজেপির রাজনীতিকে সংবাদমাধ্যমও যেভাবে বিশ্লেষণ করে, সেটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।” তিনি জোর দিয়ে বলেন, “কোনো হিন্দু কোনো সময় মৌলবাদী হতে পারে না। কোনো হিন্দু সমাজ কোনো মিলিট্যান্ট হিন্দুইজমকে (জঙ্গি হিন্দুত্ববাদ) নিতে পারবে না।” তাঁর মতে, হিন্দুত্ব কোনো ‘বাদ’ নয়, বরং ‘ইট ইজ আ ওয়ে অফ লাইফ’ (এটা জীবনের একটি ধারা)। “বহুত্ববাদই হিন্দুত্বের সবচেয়ে বড় শক্তি। যত মত, তত পথই হচ্ছে হিন্দুত্ব। ‘শৃণ্বন্তু বিশ্বে অমৃতস্য পুত্রা’ (শোনো, হে বিশ্বের অমৃতের পুত্ররা), এই কথা পৃথিবীতে আর কেউ বলেনি, এটাই হিন্দুত্ব,” ব্যাখা করেন তিনি।

বাংলায় ‘ইসলামিক ফ্যানাটিক ফ্যাসিবাদ’ ও অস্তিত্বের লড়াই:

তবে, হিন্দুত্বের এই বহুত্ববাদের ব্যাখ্যা দেওয়ার পাশাপাশি শমীক ভট্টাচার্য বর্তমানে রাজ্যে ‘ইসলামিক ফ্যানাটিক ফ্যাসিবাদ’-এর উত্থান এবং রাজ্য সরকারের ‘আত্মসমর্পণ’-এর তীব্র বিরোধিতা করেন। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ইন্দিরা গান্ধী কালচারাল অ্যাসোসিয়েশনের বইপত্র জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। এই পরিস্থিতি যাতে পশ্চিমবঙ্গে তৈরি না হয়, সেটাই বিজেপির উদ্দেশ্য।

তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, “পশ্চিমবঙ্গ তৈরি হয়েছিল হিন্দু বাঙালির হোমল্যান্ড হিসেবে।” ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বলেন, ১৯৪৭ সালে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, মেঘনাদ সাহা, রমেশচন্দ্র মজুমদার এবং কংগ্রেসের সমস্ত হিন্দু বিধায়করা পশ্চিমবঙ্গের পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন। তাঁর অভিযোগ, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই ঐতিহাসিক প্রাসঙ্গিকতাকে ভাঙতে চাইছেন এবং এটি দিল্লির কংগ্রেসের দীর্ঘদিনের ‘চক্রান্ত’। তাঁর কথায়, “বাংলার হৃতগৌরব আমাদের ফিরিয়ে আনতে হবে।”

অর্থনৈতিক অধঃপতন ও তৃণমূলের ‘দান-খয়রাতির রাজনীতি’:

রাজ্যের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে শমীক ভট্টাচার্য বলেন, ব্রিটিশ শাসনের আগে শিল্পবাণিজ্যে বাংলার অবদান ছিল ৪০ শতাংশ, যা বর্তমানে আট শতাংশে নেমে এসেছে। কৃষিজাত উৎপাদনেও বাংলা পিছিয়ে পড়েছে। তিনি তৃণমূল সরকারের ‘দান-খয়রাতির রাজনীতি’র সমালোচনা করে বলেন, “মানুষ এগুলো বোঝেন, মানুষ সচেতন।” এমএসএমই (MSME) খাতে রাজ্যকে প্রথম স্থান দেওয়ার কেন্দ্রীয় পুরস্কার নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন, কারণ তাঁর মতে, এমএসএমই-এর সংজ্ঞা বদলে দিয়ে ক্ষুদ্র দোকানদারদেরও এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যার ফলে পরিসংখ্যান বাহ্যিকভাবে ভালো দেখালেও আদতে ‘অন্তঃসারশূন্য’ অবস্থা।

মুখ্যমন্ত্রীর মুখ: জনগণই নেবে সিদ্ধান্ত:

২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি কাকে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে প্রজেক্ট করতে পারে – এই প্রশ্নের উত্তরে শমীক ভট্টাচার্য অকপটে জানান, “বাছবে তো মানুষ। মানুষ ভোট দিয়ে এই সরকারকে বিসর্জন দেবে। বিজেপি ক্ষমতায় আসবে। তারপর যাঁরা নির্বাচিত হয়ে আসবেন, তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করে বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী ঠিক করবে। বিজেপি আগে থেকে কাউকে মুখ্যমন্ত্রীর মুখ করে নির্বাচনে যায় না। এটাই আমাদের নীতি।” নরেন্দ্র মোদিকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তুলে ধরার সঙ্গে এর পার্থক্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে অন্য কারও তুলনা করা যায় না। নরেন্দ্র মোদিকে প্রধানমন্ত্রীর মুখ করা হয়েছিল কারণ, তিনি একটা মডেল দেখাতে পেরেছিলেন, ভাইব্রেন্ট গুজরাত।”

‘কুলির রাজ্য’ থেকে শিল্পায়নের স্বপ্ন:

শমীক ভট্টাচার্য আক্ষেপ করে বলেন, পশ্চিমবঙ্গ এখন ‘কুলিদের রাজ্য’তে পরিণত হয়েছে, যেখানে শিক্ষিত বাঙালিরাও কর্মসংস্থানের অভাবে ভিনরাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে যাচ্ছেন। তাঁর কথায়, “আজ বাংলা কার্যত শিক্ষিত পরিবারদের বৃদ্ধাশ্রম হয়ে দাঁড়িয়েছে।” তিনি শিল্পায়নের উপর জোর দিয়ে বলেন, “আমরা সমস্ত শিল্পপতিদের কাছে আহ্বান জানাচ্ছি অপেক্ষা করুন। আরেকটা বছর অপেক্ষা করুন। কয়েকটা মাস অপেক্ষা করুন। আমরা পরিবেশ তৈরি করব।” তিনি অভিযোগ করেন, অনেক বাঙালি শিল্পপতি এখন বাংলায় বিনিয়োগ না করে অন্য রাজ্যে কারখানা গড়ছেন।

শেষ নির্বাচন ও অস্তিত্বের লড়াই:

সাক্ষাৎকারের শেষে শমীক ভট্টাচার্য জোর দিয়ে বলেন, “ভারতীয় মুসলমানদের স্বার্থে এবং বাঙালি হিন্দুর অস্তিত্বরক্ষার স্বার্থে এটাই কিন্তু শেষ নির্বাচন।” তিনি তামিলনাড়ুর উদাহরণ টেনে বলেন, সেখানে পরিযায়ী শ্রমিকদের পরিচয় যাচাই করা হচ্ছে এবং বাংলাভাষীদের সম্পর্কে নেতিবাচক মন্তব্য আসছে, কারণ মৌলবাদ বাড়ছে এবং এই সরকার তাকে আশ্রয় দিচ্ছে। তিনি বলেন, “আমাদের দেশের একজন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর কুশপুত্তলিকার উপর আপনি থুতু ফেলবেন, লাথি মারবেন! যিনি দেশটার জন্ম দিয়েছেন, তাঁর নামাঙ্কিত লাইব্রেরিতে আগুন লাগিয়ে দেবেন! এই একই মানসিকতা বাংলাদেশে ইন্দিরা গান্ধী কালচারাল সেন্টারকে ধ্বংস করেছে। এর অবসান চাই।”

শমীক ভট্টাচার্যের এই বিস্ফোরক সাক্ষাৎকার রাজ্যের রাজনীতিতে নতুন বিতর্ক তৈরি করবে বলে ওয়াকিবহাল মহল মনে করছে।