মুখ বন্ধ করতে নির্যাতিতাকে টাকা অফার করার চেষ্টা? কসবা কান্ড নিয়ে উঠে এলো নয়া তথ্য

কসবা গণধর্ষণ কাণ্ডে পুলিশের হাতে ধরা পড়ার আগে নির্যাতিতাকে ফোন করে কেস ‘সেটল’ করার মরিয়া চেষ্টা চালিয়েছিল প্রধান অভিযুক্ত মনোজিৎ মিশ্র— এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য আগেই উঠে এসেছিল। এবার তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন, নির্যাতিতা যাতে অভিযোগ তুলে নেন, তা নিশ্চিত করতে মনোজিৎ ও তার সঙ্গীরা কি টাকার অফার করারও চেষ্টা করেছিল? এই বিষয়টি ঘিরেই নতুন করে রহস্য দানা বাঁধছে।
পুলিশের হাতে ইতিমধ্যেই ২৬ জুন সন্ধ্যা ৬টা ২৫ মিনিটে গড়িয়াহাটের ফার্ন রোডে মনোজিৎ ও তার সঙ্গী জ়ইব আহমেদের মোবাইল টাওয়ারের লোকেশন এসেছে। প্রশ্ন উঠছে, সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় গ্রেপ্তার হওয়ার ঘণ্টাখানেক আগে ফার্ন রোডে কোথায় গিয়েছিল তারা?
সূত্রের দাবি, ফার্ন রোডে এক ব্যবসায়ীর দ্বারস্থ হয়েছিল মনোজিৎরা। তাদের বড় অঙ্কের নগদ টাকার প্রয়োজন ছিল। কে সেই ব্যবসায়ী? কেনই বা তিনি শেষমেশ টাকা দিলেন না? এই বিষয়গুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। কলেজ সূত্রে খবর, তার পরিচিত আরও কয়েকজনের কাছ থেকেও মোটা অঙ্কের টাকা চেয়েছিল মনোজিৎ। তবে, সে যত টাকা চাইছিল, তা কেউই দিতে পারেননি। গোয়েন্দাদের সন্দেহ, সেই কারণেই হয়তো কারও পরামর্শে ফার্ন রোডের ওই ব্যবসায়ীর সঙ্গে মনোজিৎ দেখা করার চেষ্টা করছিল।
তদন্তকারীরা দফায় দফায় তিন মূল অভিযুক্তকে জেরা করছেন, যাতে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, দীর্ঘ সময় গা-ঢাকা দেওয়ার জন্য মনোজিতের টাকার দরকার ছিল, নাকি নির্যাতিতাকে কেস ‘সেটল’ করানোর জন্যই ওই টাকার প্রয়োজন ছিল। মনোজিতের ঘনিষ্ঠ এক ছাত্রের কথায়, “সম্ভবত দাদা ভাবেনি যে এফআইআর হবে। সেই কারণে টাকা জোগাড় করে রাখছিল, যাতে কোনোভাবে টাকা দিয়ে অভিযোগকারিণীর মুখ বন্ধ করা যায়।” মনোজিতের ‘গ্যাং অফ এইট’-এর এক মহিলা ও এক পুরুষ সদস্যকেও এ বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
কলেজের মিনিটস বুক ও লগবুক পুলিশের নজরে: ‘প্রভাবশালী’ মনোজিতের দাপট
দক্ষিণ কলকাতার ওই আইন কলেজের পরিচালন সমিতির মিনিটস বুক এবং মেন গেটের লগবুক এবার লালবাজারের গোয়েন্দাদের কড়া নজরে। গণধর্ষণের ঘটনা সামনে আসতেই মনোজিৎ মিশ্রের বিরুদ্ধে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ উঠতে শুরু করেছে।
গোয়েন্দারা খতিয়ে দেখতে চাইছেন, অতীতে কোনো ছাত্রী মনোজিতের হাতে হেনস্থার শিকার হয়ে থাকলে কলেজ কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছিলেন কি না, এবং জানিয়ে থাকলে পরিচালন সমিতির বৈঠকে তা নিয়ে কোনো আলোচনা হয়েছিল কি না, অথবা তা মিনিটস বুকে লিপিবদ্ধ করা হতো কি না।
মনোজিৎ গ্রেপ্তার হওয়ার পর আরও অনেক ছাত্রছাত্রীই তার বিরুদ্ধে মুখ খুলছেন। প্রাথমিক তদন্তে জানা যাচ্ছে, মনোজিৎ শুধু পড়ুয়াদের নয়, কলেজের নিরাপত্তারক্ষীদেরও পাত্তা দিত না। তার ইশারায় গার্ড রুম খালি করে দিতে হতো নিরাপত্তারক্ষীদের; কেউ আপত্তি করলে হুমকি এমনকি মারধরও করা হতো বলে অভিযোগ। সাধারণত, কলেজের বর্তমান ছাত্রছাত্রী বা শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীরা ছাড়া অন্য কেউ ক্যাম্পাসে ঢুকতে গেলে মেন গেটে লগবুকে নাম, ফোন নম্বর, ঠিকানা নথিভুক্ত করার নিয়ম।
অভিযোগ উঠেছে, ওই আইন কলেজে মনোজিতের সঙ্গে যাঁরা দেখা করতে আসতেন, তাঁদের জন্য এই নিয়ম কার্যকর হতো না। বহিরাগতদের সম্পর্কে যাতে কোনো তথ্য নথিভুক্ত না থাকে, তা নিশ্চিত করতে মনোজিৎ লগবুক ব্যবস্থাটাই তুলে দিয়েছিল। তার নেতৃত্বে বহিরাগতরা কলেজের গার্ডরুম বা ইউনিয়ন রুমে ইচ্ছেমতো মজলিশ বসাত। এই বিষয়ে আরও তথ্য পেতে ধৃত রক্ষী পিনাকী বন্দ্যোপাধ্যায়কেও দফায় দফায় জেরা করা হচ্ছে। ল’ কলেজে গণধর্ষণের তদন্তে ইতিমধ্যেই রেজিস্টার বাজেয়াপ্ত করেছেন তদন্তকারীরা।
গণধর্ষণের মামলার তদন্তে প্রথমে ডিভিশনাল সিট (বিশেষ তদন্তকারী দল) গঠন করা হয়েছিল। বুধবার সেই তদন্তভার গোয়েন্দা বিভাগের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। সূত্রের খবর, লালবাজারের তরফেও একটি বিশেষ সিট গঠন করা হতে পারে, যেখানে উইমেন্স গ্রিভান্স সেলের এক আধিকারিককে তদন্তকারী অফিসারের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। সাইবার বিভাগের অফিসাররাও এই দলে থাকবেন। যেহেতু ধর্ষণের সময়ে নির্যাতিতার ভিডিও করেছিল অভিযুক্তরা, তাই আগামী দিনে তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ধারাও তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করা হতে পারে। ধৃত নিরাপত্তারক্ষীকে আজ, শুক্রবার আদালতে পেশ করা হবে।