“সব মেয়েদের বিয়ের প্রস্তাব দিত মনোজিৎ, কিন্তু কেন? জেনেনিন মনোবিদরা যা বলছেন?

কসবা আইন কলেজে ঘটে যাওয়া চাঞ্চল্যকর ঘটনায় অভিযুক্ত মনোজিৎ মিশ্রের বিরুদ্ধে আরও গুরুতর অভিযোগ সামনে আসছে। প্রাক্তন সহপাঠীদের দাবি, মনোজিৎ নাকি প্রায়শই নতুন ছাত্রীদের দেখলেই তাদের ‘সেটিং করার’ চেষ্টা করতো এবং নির্দ্বিধায় ‘আমায় বিয়ে করবে?’ এমন প্রস্তাব দিত। শুধু তাই নয়, অনলাইনে ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের ভিডিও শেয়ার, মেয়েদের ট্রোলিং এবং শেমিং করার মতো অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে। প্রশ্ন উঠছে, ঠিক কোন মানসিক পরিস্থিতি থেকে একজন যুবক এমন জঘন্য কাজ করতে পারে?
মনোজিৎ মিশ্রের এই আচরণের পেছনে বেশ কিছু মনস্তাত্ত্বিক কারণ থাকতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ক্ষমতা প্রদর্শন ও নিয়ন্ত্রণ:
যৌন হয়রানিকারীদের মধ্যে ক্ষমতা প্রদর্শন এবং নিয়ন্ত্রণের প্রবণতা প্রায়শই দেখা যায়। নতুন কলেজে আসা ছাত্রীরা সাধারণত কিছুটা দুর্বল এবং অনিরাপদ বোধ করে। এই সুযোগে মনোজিৎ তাদের উপর নিজের প্রভাব খাটাতে চাইত এবং তাদের মানসিক ভাবে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করতো। ‘আমায় বিয়ে করবে?’ – এই ধরনের প্রস্তাব একাধারে ক্ষমতা প্রদর্শনের একটি কৌশল এবং প্রত্যাখ্যানের মাধ্যমে ছাত্রীর মানসিক দুর্বলতাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা।
নার্সিসিজম ও আত্মকেন্দ্রিকতা:
অনেক সময় যৌন হয়রানিকারীরা নার্সিসিস্টিক ব্যক্তিত্বের অধিকারী হয়। অর্থাৎ, তারা নিজেদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করে এবং অন্যদের অনুভূতিকে মূল্য দেয় না। তাদের কাছে অন্য ব্যক্তিরা কেবল নিজেদের চাহিদা পূরণের মাধ্যম। মনোজিতের ক্ষেত্রেও এমনটা হতে পারে যে, সে নিজেকে সর্বেসর্বা মনে করতো এবং তার চাহিদা পূরণের জন্য ছাত্রীদের ব্যবহার করতে চাইতো।
সামাজিকীকরণের অভাব ও ভুল ধারণা:
কিছু ক্ষেত্রে সঠিক সামাজিকীকরণের অভাব এবং নারী-পুরুষের সম্পর্ক সম্পর্কে ভুল ধারণা এমন আচরণের কারণ হতে পারে। সমাজে নারী-পুরুষের প্রতি যে ভুল বার্তা যায়, বিশেষ করে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার কারণে, তা এমন সহিংস ও অসম্মানজনক আচরণের জন্ম দিতে পারে। সুস্থ সম্পর্ক কী এবং সম্মতি কতটা জরুরি, এই বিষয়ে সঠিক শিক্ষাহীনতাও একটি কারণ।
নেশাগত প্রভাব:
গার্ডরুমে মদ্যপানের আসরের যে অভিযোগ উঠেছে, তা মনোজিতের আগ্রাসী ও অশালীন আচরণের কারণ হতে পারে। নেশার প্রভাবে মানুষের বিবেকবোধ ভোঁতা হয়ে যায় এবং তারা সহজেই অনুচিত কাজ করে ফেলে। মদ্যপান তার এই ধরনের আচরণকে আরও উসকে দিতে পারতো।
প্রাপ্যতা বোধ (Sense of Entitlement):
অনেক সময় কিছু পুরুষ নিজেদের অত্যন্ত ‘যোগ্য’ বা ‘প্রাপ্য’ বলে মনে করে। তাদের ধারণা হয় যে, মেয়েরা তাদের সব কথা শুনতে বাধ্য এবং তাদের যেকোনো প্রস্তাব গ্রহণ করতে বাধ্য। এই ‘প্রাপ্যতা বোধ’ থেকেই তারা মেয়েদের প্রতি অসম্মানজনক আচরণ করে।
অনলাইন ট্রোলিং ও শেমিংয়ের মানসিকতা:
অনলাইনে ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের ভিডিও শেয়ার বা ট্রোলিং-শেমিং-এর নেপথ্যে আরও জটিল মানসিকতা কাজ করে। এটি হয়তো ক্ষমতা প্রদর্শনের চরম রূপ। এর মাধ্যমে সে ভিকটিমকে মানসিকভাবে বিধ্বস্ত করতে চায় এবং সমাজের চোখে তাকে হেয় প্রতিপন্ন করতে চায়। এই ধরনের কাজে বিকৃত আনন্দ লাভ করতে পারে কিছু ব্যক্তি।
মনস্তত্ত্ববিদরা মনে করছেন, এই ধরনের ঘটনার মূলে রয়েছে এক গভীর সামাজিক সমস্যা এবং পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার প্রভাব। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে এই ধরনের ঘটনা রুখতে কেবল শাস্তিমূলক ব্যবস্থাই নয়, বরং সচেতনতা বৃদ্ধি এবং মানসিক স্বাস্থ্য কাউন্সেলিং-এর মতো পদক্ষেপও জরুরি। ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে সুস্থ সম্পর্ক, সম্মতির গুরুত্ব এবং সাইবার সুরক্ষাকে কেন্দ্র করে সচেতনতা বাড়ানো অত্যন্ত প্রয়োজন। সমাজের প্রতিটি স্তরে এই ধরনের মানসিকতার বিরুদ্ধে সরব হওয়া উচিত, যাতে কসবা কাণ্ডের পুনরাবৃত্তি না হয়।