৩২০০০ প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ, হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চের বিস্ফোরক মন্তব্য, ‘স্ক্যাম হয়েছে, দুর্নীতি বোর্ডের নথি থেকেই আসছে!’

পশ্চিমবঙ্গের ৩২ হাজার প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় ফের একবার তীব্র অসন্তোষ এবং কঠোর মন্তব্য করল কলকাতা হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ। মঙ্গলবার মামলার শুনানিতে বিচারপতি তপব্রত চক্রবর্তী সরাসরি অভিযোগ তোলেন যে, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় চরম পক্ষপাতিত্ব এবং দুর্নীতি হয়েছে, যার তথ্য বোর্ডের নিজস্ব নথি থেকেই উঠে আসছে।

আদালতের এই মন্তব্য রাজ্যজুড়ে চলমান নিয়োগ দুর্নীতি বিতর্কে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে। বিচারপতি চক্রবর্তী প্রাথমিক শিক্ষকদের আইনজীবীকে কড়া প্রশ্ন করে বলেন, “আদালত যদি দেখে যে, যথেচ্ছ দুর্নীতি হচ্ছে, প্রশাসনিক কর্তারা যুক্ত আছেন, মন্ত্রী যুক্ত আছেন তখন আমরা (বিচারপতিরা) কী করব? কিছুই করব না?” এই মন্তব্যের মাধ্যমে বিচারক বিচারব্যবস্থার দায়বদ্ধতা এবং দুর্নীতি দমনে তার দৃঢ় মনোভাব স্পষ্ট করেছেন।

বিচারপতি তপব্রত চক্রবর্তী আরও বলেন, “পেজ ২৩৭ দেখুন। ৪২৯৪৯ নিয়োগের RTI উত্তর সংক্রান্ত নথি। বোর্ডের কাছ থেকেই কৈফিয়ত চাইব যথাসময়ে।” তার এই মন্তব্য ইঙ্গিত দেয় যে, আদালতের কাছে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ রয়েছে এবং ভবিষ্যতে প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদকে এই বিষয়ে জবাবদিহি করতে হবে।

বিচারপতি চক্রবর্তী আবারও প্রশ্ন তোলেন, “যদি একজন বিচারপতি দেখেন যে টাকার বিনিময়ে চাকরি দেওয়া হয়েছে, অনিয়ম হয়েছে, দুর্নীতি হয়েছে সেক্ষেত্রে একজন বিচারপতি কি করবেন? চোখ বন্ধ করে থাকবেন?” এই প্রশ্ন তার ক্ষোভ এবং বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে উদ্বেগেরই প্রতিফলন।

প্রাথমিক শিক্ষকদের আইনজীবী অনিন্দ্য মিত্র অবশ্য ভিন্ন যুক্তি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “প্রাথমিক দুর্নীতির জন্য দায়ী প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদ। আদালত যাকে দুর্নীতিবাজ মনে করছে সেই প্রাথমিক পর্ষদের কাছেই আবার পাঠাচ্ছে প্রক্রিয়া নতুন করে করার জন্য। এটা কী ধরনের ন্যায় বিচার? প্রাথমিক পর্ষদের জন্য যদি একটা দুর্নীতি হয়ে থাকে। সেই পর্ষদের কাছে ফের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করতে পাঠালে আরও একটা দুর্নীতি হতে পারে।” তিনি প্রশ্ন তোলেন, নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করতে আদালত কেন দুর্নীতিগ্রস্ত বলে চিহ্নিত পর্ষদকেই আবার দায়িত্ব দিচ্ছে।

এর উত্তরে বিচারপতি তপব্রত চক্রবর্তী পাল্টা প্রশ্ন করেন, “নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করতে কোথায় পাঠানো উচিত?” জবাবে আইনজীবীরা ‘অন্য কোনো সংস্থা’র কথা বলেন।

বিচারপতি চক্রবর্তী শেষ করেন এই বলে যে, “৫ বছর পর আপনারা এসে বলছেন আপনাদের রুটি, মাখন কেড়ে নেওয়া হয়েছে। বলছেন দুর্নীতি হয়েছে অথচ এখানে হস্তক্ষেপ করতে বারণ করছেন।” বিচারকের এই মন্তব্য থেকে বোঝা যাচ্ছে যে, তিনি মামলার জটিলতা এবং এর দীর্ঘসূত্রিতা নিয়েও অসন্তুষ্ট।

প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগের মতো একটি স্পর্শকাতর মামলায় আদালতের এই কড়া পর্যবেক্ষণ এবং প্রশ্ন সরাসরি রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থায় দুর্নীতির গভীর শিকড়কেই তুলে ধরছে। এই মন্তব্য আগামী দিনে এই মামলার গতিপ্রকৃতি এবং রাজ্য সরকারের নিয়োগ নীতির উপর বড় প্রভাব ফেলবে বলেই মনে করা হচ্ছে।