মণিপুরে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, কেএনএ উপপ্রধানসহ ৪ নিহত, ইউকেএনএ’র প্রতিশোধের দাবি

মণিপুরের চূড়াচাঁদপুর জেলা সোমবার এক ভয়াবহ বন্দুকযুদ্ধে আবারও রক্তে রঞ্জিত হলো। কুকি ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন (KNO)-এর অন্তর্ভুক্ত জঙ্গি সংগঠন কুকি ন্যাশনাল আর্মি (KNA)-র উপপ্রধান থেঙ্কোথাং হাউকিপ ওরফে থাহপি (৪৮) এই হামলায় নিহত হয়েছেন। একই ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন আরও দুই KNA সদস্য এবং একজন নিরপরাধ পথচারী। এই মর্মান্তিক ঘটনাটি রাজ্যটিতে বিদ্যমান জাতিগত সংঘাত ও অস্থিরতাকে আরও একবার প্রকট করে তুলল।
মৃত্যুফাঁদ পাতা হয়েছিল সাদা SUV-তে
স্থানীয় সূত্র ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সোমবার দুপুর আনুমানিক ২টা নাগাদ চূড়াচাঁদপুরের মংজাং গ্রামে এই প্রাণঘাতী হামলা ঘটে। KNA-এর উপপ্রধান থেঙ্কোথাং হাউকিপসহ নিহত অপর দুই KNA সদস্য সেখোগিন (৩৪) এবং লেংগুহাও (৩৫) একটি সাদা এসইউভি (SUV) গাড়িতে করে যাচ্ছিলেন। উল্লেখ্য, নিহত লেংগুহাও ছিলেন KNO প্রধান পিএস হাউকিপের জামাতা। অকস্মাৎ, প্রতিদ্বন্দ্বী জঙ্গি সংগঠন ইউনাইটেড কুকি ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি (UKNA)-র সদস্যরা তাঁদের ওপর অতর্কিত গুলি চালায়। হামলার তীব্রতা এতটাই ছিল যে, ঘটনাস্থলেই তিন KNA সদস্যের মৃত্যু হয়।
এই হামলায় ফালহিং (৭২) নামের এক নিরীহ পথচারীও প্রাণ হারান। চূড়াচাঁদপুরের কৈট এলাকার বাসিন্দা ফালহিং ঘটনার আকস্মিকতায় হতবাক হয়ে পড়েন এবং দুর্ভাগ্যজনকভাবে প্রাণ দেন।
UKNA-র দাবি: প্রতিশোধের আগুন
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে (বিশেষত হোয়াটসঅ্যাপে) ছড়িয়ে পড়া একটি UKNA বিবৃতিতে এই হামলার দায় স্বীকার করা হয়েছে। UKNA দাবি করেছে, KNA-এর হাতে তাদের এক নেতা এবং আরও ৩০ জন সদস্য নিহত হওয়ার প্রতিশোধ হিসেবেই এই হামলা চালানো হয়েছে। এই দাবি মণিপুরের দীর্ঘদিনের জাতিগত সংঘাতের গভীরে প্রোথিত হিংসা এবং প্রতিহিংসার চক্রকে আবারও সামনে এনেছে। পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে গোটা এলাকা ঘিরে ফেলেছে এবং ব্যাপক তল্লাশি অভিযান শুরু করেছে। যদিও, এই বিষয়ে এখনও পর্যন্ত কোনো সরকারি বিবৃতি প্রকাশ করা হয়নি।
SoO চুক্তি এবং জটিল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
এই হামলার ঘটনা মণিপুরের জটিল রাজনৈতিক ও জাতিগত সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলেছে। KNA যে KNO-এর অংশ, সেই KNO কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের সঙ্গে ‘সাসপেনশন অব অপারেশনস’ (SoO) চুক্তির স্বাক্ষরকারী। এই চুক্তি অনুযায়ী, KNO সদস্যদের নির্দিষ্ট ক্যাম্পে থাকতে হয়, অস্ত্র জমা রাখতে হয় এবং নিরাপত্তা বাহিনীর নজরদারিতে থাকতে হয়। তবে, হামলাকারী UKNA এই চুক্তির অংশ নয়, যা তাদের বেপরোয়া কার্যকলাপের একটি কারণ হতে পারে। উল্লেখ্য, গত ৮ই মার্চ আসাম রাইফেলস চূড়াচাঁদপুরের হেংলেপ গ্রামে UKNA-র একটি গোপন ক্যাম্প ধ্বংস করেছিল, যা জঙ্গলের আড়ালে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল।
সম্প্রতি, KNO এবং ইউনাইটেড পিপলস ফ্রন্ট (UPF)-এর নেতারা দিল্লিতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের (MHA) আধিকারিকদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে মণিপুরের একাংশকে একটি পৃথক প্রশাসনিক এলাকা বা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হিসেবে ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এই ঘটনাপ্রবাহ স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে, মণিপুরে শান্তি ফেরানোর প্রচেষ্টা আবারও এক কঠিন পরীক্ষার মুখে দাঁড়িয়ে। এই হামলা কেবল দুটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যেকার সংঘাত নয়, বরং এটি মণিপুরের জাতিগত বিভেদ, বিচ্ছিন্নতাবাদী রাজনীতি এবং অস্থির পরিস্থিতির এক বিপজ্জনক চিত্র তুলে ধরেছে। রাজ্যের শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সরকারের ওপর চাপ আরও বাড়বে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।