কসবা গণধর্ষণ কাণ্ডের আড়ালে প্রকাশ্যে এল ‘দাদা’ মনোজিতের রক্তাক্ত ইতিহাস

কসবা আইন কলেজে প্রথম বর্ষের এক ছাত্রীর গণধর্ষণকাণ্ডের ঘটনাটি কি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ? নাকি এর পিছনে লুকিয়ে আছে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে অপরাধের এক ভয়ঙ্কর সাম্রাজ্য? তদন্ত যতই গভীরে যাচ্ছে, মূল অভিযুক্ত মনোজিত সরকার ওরফে ‘দাদা’-র অন্ধকার অতীত এবং তাকে ঘিরে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক ছত্রছায়ার কাহিনী সামনে আসছে, যা স্তম্ভিত করে দিয়েছে গোটা রাজ্যকে।

শুরুটা যেভাবে:
মনোজিত সরকারের অপরাধ জীবনের সূচনা হয়েছিল সাউথ কলকাতা ল কলেজে ভর্তির পরপরই। ২০১২ সালে কলেজে প্রবেশ করে ২০১৩ সালেই সে এক ভয়ঙ্কর অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। কালীঘাট থানা এলাকায় এক ক্যাটারিং কর্মীর আঙুল কেটে দেওয়ার অভিযোগে তাকে কলেজ থেকে বহিষ্কার করা হয়। এই ঘটনায় সে তিন বছর ওড়িশায় আত্মগোপন করে ছিল। কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, ২০১৭ সালে কীভাবে একজন বহিষ্কৃত ও গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি আবার কলেজে রি-অ্যাডমিশন পাওয়ার সুযোগ পায়?

সাসপেনশন-বহিষ্কার, তবু কীভাবে ফিরল ক্যাম্পাসে?
২০১৮ সাল থেকে মনোজিতের অপকর্মের তালিকা ফের বাড়তে শুরু করে। সে বছর অন্তত দুজন ছাত্রী তাঁর বিরুদ্ধে সরাসরি যৌন হেনস্থার অভিযোগ আনেন, যার মেডিক্যাল পরীক্ষাও হয়েছিল কলকাতার এনআরএস হাসপাতালে। কিন্তু রহস্যজনক কারণে মামলাটি এগোয়নি। কলেজ কর্তৃপক্ষ তাকে চার বছরের জন্য সাসপেন্ড করে দেয়, তবে শর্ত ছিল- কেবল পরীক্ষার দিনেই সে কলেজে প্রবেশাধিকার পাবে। ২০২২ সালে সেই সাসপেনশনের মেয়াদ শেষ হতেই মনোজিত নতুন উদ্যমে ক্যাম্পাসে ফিরে আসে। ২০২৩ সাল থেকে সে আবার ‘দাদা’ পরিচয়ে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে।

একের পর এক অভিযোগ, তবুও পার পেয়েছেন
২০২৩ সালেই তার বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ দায়ের হয়। ২৩ মার্চ এক ছাত্রীকে উত্যক্ত করার অভিযোগ ওঠে, যা নিয়েও চাঞ্চল্য ছড়ায়। একই বছরে মারধরের অভিযোগে কসবা (১ ডিসেম্বর) এবং টালিগঞ্জ (৭ সেপ্টেম্বর) থানায় তার বিরুদ্ধে আরও দুটি মামলা দায়ের হয়। এতগুলি অভিযোগ, বহিষ্কার এবং সাসপেনশনের পরেও যে ব্যক্তি শিক্ষাঙ্গনে অবাধে বিচরণ করতে পারছিল, তার অপরাধের চরম পরিণতি ঘটল প্রথম বর্ষের এক ছাত্রীর গণধর্ষণের ঘটনায়। এই ঘটনায় মনোজিতকে মদত দেওয়ার অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছে আরও দুই ছাত্র, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা তৃণমূল ছাত্রপরিষদের একাধিক নেতার ঘনিষ্ঠ ছিল।

সিস্টেমের ব্যর্থতা: প্রশ্নের মুখে প্রশাসন ও রাজনৈতিক মদত
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই অপরাধের জন্য কেবল মনোজিতই দায়ী? কেন একজন দাগী অপরাধী একাধিক অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও আইনি প্রক্রিয়ায় সাজা পেল না? কে তাকে বাঁচাত? এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছাত্রনেতারা কেন এতদিন ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিলেন? ছাত্রীদের একাংশ এবং অভিভাবকদের প্রশ্ন- এই ব্যর্থতা কি কেবল কলেজ প্রশাসনের, নাকি এর পিছনে লুকিয়ে আছে গভীর রাজনৈতিক মদত?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কসবার ঘটনাটি কেবল একটি ধর্ষণের মামলা নয়; এটি রাজনীতির ছত্রছায়ায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অপরাধপ্রবণতার এক দীর্ঘস্থায়ী সংস্কৃতির করুণ চিত্র। এই ঘটনা প্রমাণ করে দিল, যখন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, তখন তার চরম মূল্য দিতে হয় সাধারণ মানুষকে।