“মনোজিৎকে ক্যাম্পাস ছাড়িয়েছিলেন প্রিন্সিপাল”-সেই সাসপেন্ডড ‘ম্যাঙ্গো’ই পরে কলেজের ‘দাদা’!

দক্ষিণ কলকাতার এক নামকরা কলেজে গণধর্ষণের ঘটনায় মূল অভিযুক্ত মনোজিৎ মিশ্র ওরফে ‘ম্যাঙ্গো’র গ্রেফতারির পর থেকে তার অস্বাভাবিক উত্থান এবং এর পেছনে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। যে ছেলেটি একসময় কলেজ ক্যাম্পাসে ঢুকতেই পারত না, সেই কিনা ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর থেকে হয়ে ওঠে কলেজের সর্বেসর্বা, তার বিরুদ্ধবাদীদের ক্যাম্পাস ছাড়া করে। কীভাবে এই ‘ডন’-এর জন্ম হলো এবং কারা তাকে মদত দিয়েছে, তা নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠছে।

২০১৪ সালে মনোজিৎ ছাত্র হিসেবে কলেজে প্রবেশ করার পর থেকেই ‘নটোরিয়াস’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। মারধর, হুমকি, মহিলাদের সঙ্গে অশালীন আচরণ, নিরাপত্তারক্ষীদের প্রহার, শিক্ষকদের হেনস্থা – এমন অসংখ্য অপরাধে তার নাম জড়ায়। ওই কলেজের প্রাক্তন প্রিন্সিপাল, প্রয়াত দেবাশিস চট্টোপাধ্যায় ছিলেন মনোজিতের প্রধান প্রতিপক্ষ। শাসকদলের ছাত্র সংগঠনের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে দেবাশিস অন্তত তিনবার মনোজিৎকে সাসপেন্ড করেছিলেন। ২০১৭ সালে কলেজের পুরোনো ক্যাম্পাসে ভাঙচুর চালানোর ঘটনায় মনোজিতের বিরুদ্ধে এফআইআর করেন প্রয়াত অধ্যক্ষ। গড়িয়াহাট থানা তাকে গ্রেপ্তার করলেও, জেল থেকে বেরিয়েই মনোজিৎ ও তার গ্যাং ক্যাম্পাসের সিসিটিভি ভাঙচুর করে। দেবাশিসের উদ্যোগেই তৎকালীন পরিচালন সমিতি রেজোলিউশন করে মনোজিতের ক্যাম্পাসে প্রবেশাধিকার কেড়ে নেয়।

এর ফলে দীর্ঘ পাঁচ বছর মনোজিৎ ক্যাম্পাসে ঢুকতে পারেনি। কিন্তু ২০১৮ সালে দেবাশিস চট্টোপাধ্যায়ের আকস্মিক প্রয়াণের পর পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। দেবাশিস চট্টোপাধ্যায়ের স্ত্রী, দীনবন্ধু অ্যান্ড্রুজ কলেজের ফিলোসফির অধ্যাপিকা নবনীতা চক্রবর্তী হতবাক হয়েছেন যখন তার স্বামীর মৃত্যুর পর সেই কলেজেরই পরিচালন সমিতি ম্যাঙ্গোকে অস্থায়ী কর্মী হিসেবে নিয়োগ করে। নবনীতা দেবীর কথায়, “এই ছেলেটা দেবাশিসের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছিল। রাতের পর রাত ঘুমোতে দেয়নি। কলেজে যাওয়াটা ওঁর কাছে আতঙ্কে পরিণত হয়েছিল। শারীরিক, মানসিক হেনস্থা, ঘেরাও, প্রিন্সিপালের ঘর ভাঙচুর, ক্যাম্পাসে সন্ত্রাসের পরিস্থিতি বানানো… অনেকের আপত্তি উড়িয়ে দেবাশিস ওকে শায়েস্তা করতে পেরেছিলেন।”

ফিনিক্সের মতো ফিরে আসা: টিএমসিপির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন:

মনোজিৎ কীভাবে আবার ক্যাম্পাসে ফিরলো? এই প্রশ্নের জবাবে উঠে আসছে একাধিক চাঞ্চল্যকর তথ্য। অনেকেই জানাচ্ছেন, তৃণমূল ছাত্র পরিষদের (টিএমসিপি) রাজ্যস্তরের একাধিক নেতার সঙ্গে তার ‘দেওয়া-নেওয়া’র সম্পর্কই ‘ম্যাঙ্গো’কে ফিনিক্স পাখির মতো ফিরিয়ে এনেছে।

কলেজ সূত্রে জানা গেছে, ২০২২ সালের শেষের দিকে ওই কলেজের তৎকালীন টিএমসিপি ইউনিটের বিরুদ্ধে আর্থিক তছরূপ ও ভর্তি দুর্নীতিতে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে। এর জেরে সংগঠনের জেলা ও রাজ্য নেতৃত্ব সেই ইউনিট ভেঙে দেয়। নতুন ইউনিট গড়ার জন্য কিছু পড়ুয়ার নামের তালিকা দক্ষিণ কলকাতা টিএমসিপি এবং রাজ্য কমিটির কাছে জমা পড়ে। তখন কলেজ ‘দেখভাল করতেন’ টিএমসিপির লিগ্যাল সেলের নেতা, বর্তমানে সাসপেন্ডেড প্রান্তিক চক্রবর্তী। কিন্তু কোনো অজ্ঞাত কারণে সেই ইউনিট তৈরি হয়নি। বরং ক্যাম্পাসে এতদিন ব্রাত্য থাকা ম্যাঙ্গো ওরফে মনোজিতের হাতে আচমকা গোটা কলেজের দায়িত্ব ছেড়ে দেয় টিএমসিপি। প্রান্তিকের বক্তব্য, “মনোজিতকে বাদ দিয়েই নেতৃত্বকে ওই কলেজের তৎকালীন পড়ুয়াদের রেখে ইউনিটের নাম জমা করেছিলাম। কিন্তু নেতৃত্ব মানেনি। কেন, আমি জানি না।”

বহু পড়ুয়ার দাবি, কলেজের সিট বিক্রি থেকে ফেস্টের নামে টাকা তোলা – এমন একাধিক অনিয়ম এর পেছনে থাকতে পারে। এই সূত্রেই দক্ষিণ কলকাতার টিএমসিপি সভাপতি এবং বর্তমানে যুব তৃণমূলের ওই এলাকার সভাপতি তথা আশুতোষ কলেজের কর্মী সার্থক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম উঠে আসছে।

ভাইরাল ছবি ও রাজনৈতিক চাপানউতোর:

ওই কলেজের দেওয়ালে এখনও জ্বলজ্বল করছে ‘টিএমসিপি, আমরা সবাই সার্থক’ লেখা। এই সার্থক কি আসলে সার্থক বন্দ্যোপাধ্যায়? ধৃত মনোজিতের সঙ্গে সার্থকের একাধিক ছবি এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল। সার্থক যুব সংগঠনের দায়িত্ব পাওয়ার পর মনোজিৎ তাকে সংবর্ধনা জানিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছবিও দিয়েছিল কিছুদিন আগে।

টিএমসিপির রাজ্যস্তরের এক ছাত্রনেতার কথায়, “মনোজিৎ তো এই সার্থকেরই ডানহাত। আগে গুরুতর অভিযোগের পরেও কেন পুলিশ ওকে গ্রেপ্তার করেনি? কে পরিচালন সমিতির সঙ্গে কথা বলে ওকে ক্যাম্পাসে ঢোকার লাইসেন্স এবং অস্থায়ী চাকরি পাইয়ে দিয়েছে, সার্থককে জিজ্ঞাসা করা হোক!”

তবে সার্থক বন্দ্যোপাধ্যায় এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, “দল আমাকে জেলার ছাত্র সংগঠনের দায়িত্ব দিয়েছিল। এমন ছবি অনেক থাকতে পারে। কিন্তু মনোজিতের সঙ্গে আমার বাড়তি কোনো ঘনিষ্ঠতা নেই।” তিনি আরও বলেন, “ধর্ষকের কোনো পরিচয় হয় না। ধর্ষক ধর্ষকই। আমি ওর সর্বোচ্চ শাস্তি চাই।”

টিএমসিপি রাজ্য নেতৃত্বের বিরুদ্ধেও প্রশ্ন উঠেছে যে, কেন ইউনিট না গড়ে ম্যাঙ্গোর হাতে সব দায়িত্ব ছাড়া হয়েছিল। ছাত্র সংগঠনের রাজ্য সভাপতি তৃণাঙ্কুর ভট্টাচার্যের জবাব, “আমরা ভালো ছেলেমেয়ের সন্ধানে ছিলাম। কিন্তু মনোজিতকে কখনও নেতৃত্ব ছাড়া হয়নি। ও নিজেই ঘোষণা করলে তো আর নেতা হয়ে যায় না!”

গণধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের ঘটনায় মূল অভিযুক্তের এমন প্রভাবশালী হয়ে ওঠা এবং তার পেছনে রাজনৈতিক যোগসাজশের অভিযোগ রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থা ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, এই তদন্তের মাধ্যমে আসল সত্য কতটা উন্মোচিত হয় এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়।