‘রাত দখলের’ পড়ুয়াদেরও ছাড়েনি মনোজিতের গ্যাং, থানায় হয়েছে আগেও বহু নালিশ!

কসবা আইন কলেজে এক ছাত্রীকে গণধর্ষণের ঘটনায় মনোজিৎ মিশ্রের গ্রেফতারি কেবল একটি সাম্প্রতিক অপরাধের পর্দাফাঁস নয়, বরং দক্ষিণ কলকাতার এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তার দীর্ঘদিনের ‘সন্ত্রাসরাজ’ এবং রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় বেড়ে ওঠা এক অপ্রতিরোধ্য দাপটের চিত্র তুলে ধরেছে। আরজি কর আন্দোলনের ‘রাত দখল’ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া ছাত্রছাত্রীদের ওপর তার প্রতিহিংসামূলক হামলা, মারধর ও কলেজ থেকে বিতাড়নের পুরোনো অভিযোগগুলো এখন নতুন করে সামনে আসছে।
গত বছর ১৪ অগাস্ট আরজি করের ‘রাত দখল’ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া দক্ষিণ কলকাতার আইন কলেজের বেশ কিছু শিক্ষার্থী এখন বলছেন যে, মনোজিৎ মিশ্র এবং তার দলবল ফেসবুক লাইভ দেখে কারা কারা ওই আন্দোলনে গিয়েছিলেন, তার তালিকা তৈরি করেছিল। এরপর তাদের কলেজে ডেকে পাঠিয়ে হুমকি দেওয়া হয়, এমনকি মারধরও করা হয়। এক ছাত্র প্রতিবাদ করায় তাকে লেক মলের সামনে থেকে জোর করে তুলে নিয়ে গিয়ে বেধড়ক মারধর করা হয়, যার ফলে সে অচৈতন্য হয়ে পড়েছিল।
মনোজিতের হাতে মার খেয়ে অচৈতন্য হয়ে পড়া সেই ছাত্র আজ জানিয়েছেন, “আমরা অন্তত ১০-১২ জন ছাত্রছাত্রী এমন আছি, যারা ওঁর ভয়ে গত এক বছর ধরে ক্যাম্পাসেই ঢুকতে পারি না। আমাদের অপরাধ, কেন আমরা রাত দখলের আন্দোলনে গিয়েছিলাম!” এসব ঘটনায় মনোজিৎদের বিরুদ্ধে অপহরণ, মারধর-সহ একাধিক ধারায় মামলা দায়ের হলেও, পুলিশ নাকি তার ‘কেশাগ্র’ও স্পর্শ করতে পারেনি। এটি পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।
অভিযোগ উঠেছে, কলেজ ক্যাম্পাসে মনোজিতের এতটাই প্রভাব ছিল যে, শিক্ষকরাও তার মুখের ওপর কথা বলার সাহস পেতেন না। ‘রাত দখল’ কর্মসূচি ছাড়াও কলেজে মনোজিতের বিরুদ্ধে কোনো কথা বললেই ক্যাম্পাসের ভেতরে বা বাইরে মারধর করে সংশ্লিষ্ট ছাত্রছাত্রীদের কলেজ-ছাড়া করা হতো। পুলিশ সূত্রে খবর, মনোজিতের নামে অন্তত ২০টি মামলা রয়েছে। ২০১৭ সালে কলেজে ভাঙচুর এবং সিসিটিভি ভাঙচুরের ঘটনাতেও তার নাম জড়িয়েছিল। এমনকি, প্রয়াত প্রিন্সিপাল দেবাশিস চট্টোপাধ্যায়ের অভিযোগের ভিত্তিতে একবার তাকে গ্রেফতারও করা হয়েছিল এবং কলেজ কর্তৃপক্ষ তাকে তিনবার সাসপেন্ডও করেছিল, কিন্তু তাকে বাগে আনা যায়নি কখনোই।
কলেজ সূত্রে জানা গেছে, ২০১৪ সালে মনোজিৎ ছাত্র হিসেবে কলেজে ভর্তি হলেও পাশ করতে না পারায় ডিসকলেজিয়েট হয়ে যান। প্রথম থেকেই তিনি তৃণমূল ছাত্র পরিষদের (TMCP) সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং ইউনিট প্রেসিডেন্টও হয়েছিলেন। পরে ২০২১ সালে তাকে দক্ষিণ কলকাতার সাংগঠনিক সম্পাদকও করা হয়। যদিও TMCP-এর রাজ্য সভাপতি তৃণাঙ্কুর ভট্টাচার্য দাবি করেছেন, মনোজিৎ বর্তমানে সংগঠনের কোনো পদে ছিলেন না। অভিযোগ, প্রভাব খাটিয়েই মনোজিৎ আবার ছাত্র হিসেবে কলেজে ঢুকে পড়েন। প্রায় তিন বছর আগে পাশ করলেও সে কলেজ ছাড়েনি এবং তার বিরুদ্ধে বারবার অভিযোগ উঠলেও কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
মনোজিৎ তার বাবার সঙ্গে কালীঘাট অঞ্চলেই থাকেন। এলাকার লোক তাকে ‘ম্যাঙ্গো’ নামে চেনে। এলাকার সূত্রে জানা যায়, তার মা ও বোন তাদের সঙ্গে থাকেন না। মনোজিতের বাবা অবশ্য বলছেন, “আমার ছেলে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে থাকতে পারে।”
কলেজের এক ছাত্র জানিয়েছেন, তারা বহুবার মনোজিতের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলে মার খেয়ে কলেজ-ছাড়া হয়েছেন। এমনকি, ২০২৪ সালে যখন তাকে কলেজের ক্যাজুয়াল স্টাফ হিসেবে নেওয়ার কথা শোনা যায়, তখনও তারা আপত্তি তুলেছিলেন, কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। কয়েকজন ছাত্রীও অভিযোগ করেছিলেন, যাদের বাড়ি বা মেসের সামনে গুন্ডা পাঠিয়ে ভয় দেখাত মনোজিৎ।
এই ঘটনায় অভিযুক্ত আরও দু’জন—প্রমিত মুখোপাধ্যায় (দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র, হাওড়ার বাসিন্দা) এবং জ়ইব আহমেদ (প্রথম বর্ষের ছাত্র, তিলজলার বাসিন্দা)—মনোজিতের ‘দু’হাত’ হিসেবে পরিচিত ছিল। অভিযোগ, ধর্ষণের সময়েও জ়ইব আর প্রমিতই ঘর আটকে পাহারা দিয়েছিল। বহু পড়ুয়ার দাবি, কলেজে নেশার আসর, টাকার বিনিময়ে ভর্তি বা ফেস্টের নামে অশালীন ফূর্তি—সবকিছুতেই এই তিনজনের নাম কমন ছিল।
কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল নয়না চট্টোপাধ্যায় অবশ্য দাবি করেছেন, মনোজিতের ক্যাজুয়াল স্টাফ হিসেবে নিয়োগ ‘কলেজ পরিচালন সমিতির রেজোলিউশন’ অনুযায়ী হয়েছিল এবং তার কাছে সব ডকুমেন্ট রয়েছে। কসবা ল’ কলেজের নির্যাতিতার মেডিক্যাল রিপোর্টে ‘গোপনাঙ্গে ক্ষত, গলায় কামড়ের দাগ’-এর মতো নৃশংস নির্যাতনের চিহ্ন পাওয়া গেছে, যা এই ঘটনার ভয়াবহতাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। এই ঘটনা পুরো ব্যবস্থার ওপর প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে।