“কসবার নির্যাতিতার শরীরে কামড়ের দাগ”-মেডিক্যাল পরীক্ষায় আর যা যা তথ্য পাওয়া গেলো?

আরজি করের ভয়ঙ্কর স্মৃতি এখনো টাটকা, তার রেশ কাটতে না কাটতেই এবার কসবার সাউথ ক্যালকাটা ল’কলেজে ঘটল আরও এক বর্বরোচিত গণধর্ষণের ঘটনা। এই ঘটনায় রাজ্যের শিক্ষাঙ্গন ও আইন-শৃঙ্খলার পরিস্থিতি নিয়ে ফের গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। তিন অভিযুক্তকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ, যার মধ্যে একজন শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের ছাত্র সংগঠনের প্রাক্তন নেতা। নির্যাতিতা আইনের ছাত্রী অভিযুক্তদের একজনের বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার জেরেই এই পাশবিক অত্যাচারের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বুধবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা থেকে রাত ১০টা ৫০ মিনিটের মধ্যে দক্ষিণ কলকাতা আইন কলেজের ক্যাম্পাসেই ঘটে এই নৃশংস ঘটনা। নির্যাতিতা ছাত্রীর অভিযোগ, অভিযুক্তরা তাকে জোর করে কলেজের একটি নির্জন ঘরে, এমনকি ক্যাম্পাসের নিরাপত্তারক্ষীর ঘরে নিয়ে যায়। সেখানেই চলে তার ওপর পাশবিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। মেডিক্যাল পরীক্ষায় ধর্ষণের প্রমাণ মিলেছে এবং নির্যাতিতার শরীরে জোর-জবরদস্তি, কামড়ের চিহ্ন ও নখের আঁচড়ের প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
প্রাথমিক অভিযোগ অনুযায়ী, তিন অভিযুক্তের মধ্যে একজন ধর্ষণ করেছে এবং বাকি দুজন তাতে সহযোগিতা করেছে। তবে পুলিশ জানিয়েছে, এই ঘটনায় তিন অভিযুক্তের বিরুদ্ধেই গণধর্ষণের অভিযোগ আনা হবে। নির্যাতিতা তার অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেছেন যে, প্রধান অভিযুক্তরা তাকে জোর করে আটকে রেখেছিল এবং তার প্রেমিককে হত্যা ও তার বাবা-মাকে গ্রেফতারের হুমকি দিয়েছিল। তিনি আকুতি জানালেও তারা তাকে ছাড়েনি। আরও অভিযোগ, অভিযুক্তরা এই ঘটনার ভিডিও রেকর্ড করে এবং অসহযোগিতা করলে তা ফাঁস করে দেওয়ার হুমকিও দেয়। ছাত্রীটি প্রতিরোধের চেষ্টা করলে তাকে হকি স্টিক দিয়ে আঘাত করা হয়।
এই ঘটনার মূল অভিযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস ছাত্র পরিষদের (TMCP) দক্ষিণ কলকাতা জেলার প্রাক্তন ছাত্র ও বর্তমান সাধারণ সম্পাদক মনোজিৎ মিশ্র (৩১)। এছাড়াও প্রথম বর্ষের ছাত্র জায়েব আহমেদ (১৯) এবং প্রমিত মুখোপাধ্যায় (২০) এই ঘটনায় জড়িত। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে গভীর রাতের মধ্যে তিনজনকেই গ্রেফতার করা হয়েছে।
মনোজিৎ মিশ্রের রাজনৈতিক সংযোগ নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের মধ্যেই তৈরি হয়েছে অস্বস্তি। TMCP সভাপতি তৃণাঙ্কুর ভট্টাচার্য স্বীকার করেছেন যে, তারা কল্পনাও করতে পারেননি মনোজিৎ এমন জঘন্য অপরাধে জড়িত হতে পারে। তবে তিনি এও দাবি করেছেন যে, অভিযুক্তের সঙ্গে দলের বর্তমান কোনো সম্পর্ক নেই এবং সে ছাত্র সংগঠনের কোনো প্রধান পদেও ছিল না। তিনি বলেন, “আমরা স্বীকার করছি এটি একটি ভুল ছিল। আমরা অনুমান করতে পারিনি যে একজন ছাত্র নেতা, যাকে আমরা ছাত্রাবস্থায় আমাদের দলে অন্তর্ভুক্ত করেছিলাম, সে এমন অপরাধ করবে।” তবে, তৃণাঙ্কুর অভিযুক্তের কঠোর শাস্তি দাবি করেছেন।
এই গণধর্ষণের ঘটনা দ্রুতই রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে। তৃণমূল কংগ্রেস তাদের ‘এক্স’ হ্যান্ডেলে একটি দীর্ঘ বিবৃতিতে ন্যায়বিচারের আশ্বাস দিয়েছে। অন্যদিকে, বিজেপি আইটি সেলের প্রধান অমিত মালব্য মনোজিৎ মিশ্রের সঙ্গে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ একাধিক তৃণমূল নেতার ছবি শেয়ার করে তৃণমূলকে আক্রমণ করেছেন। যদিও তৃণমূল কংগ্রেস দাবি করেছে, ছবিগুলি “সামাজিক অনুষ্ঠান” থেকে তোলা এবং অভিযুক্তদের সঙ্গে তাদের কোনো যোগসূত্র নেই।
বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী এই ঘটনার জন্য কলকাতা পুলিশকে “সম্পূর্ণভাবে দায়ী” করেছেন। তিনি কটাক্ষ করে বলেছেন, “পুরো কলকাতা পুলিশকে (রথযাত্রার জন্য) দিঘায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কলকাতা পুলিশ সেখানে কী করছে? মুখ্যমন্ত্রীর তার চেয়ারে থাকার কোনো অধিকার নেই। আমরা এটি তুলে নেব।”
জাতীয় মহিলা কমিশন (NCW) এই ঘটনার বিষয়ে খোঁজ নিয়েছে এবং কলকাতা পুলিশ কমিশনারকে চিঠি লিখে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা দ্রুত তদন্তের নির্দেশ দিয়ে তিন দিনের মধ্যে কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে, তার রিপোর্ট চেয়েছেন। এই ঘটনা আবারও রাজ্যের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রনেতা ও রাজনৈতিক প্রভাবের অপব্যবহার নিয়ে জনমনে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।