“কার সঙ্গে ঘুরছেন…?”-কসবার কলেজে গণধর্ষণ কাণ্ডে কল্যাণ গাঙ্গুলির বিতর্কিত মন্তব্য

কসবার আইন কলেজে এক ছাত্রীকে গণধর্ষণের ঘটনায় রাজ্য রাজনীতিতে ঝড় উঠেছে। এই নৃশংস ঘটনায় মূল অভিযুক্ত মনোজিত মিশ্রের তৃণমূল ছাত্র পরিষদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা নিয়ে যেমন প্রশ্ন উঠছে, তেমনই কলেজের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও আঙুল তুলেছে বিভিন্ন মহল। এই পরিস্থিতিতে মুখ খুলেছেন তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি ঘটনার তীব্র নিন্দা করার পাশাপাশি বেশ কিছু মন্তব্য করেছেন যা নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “নারীদের রক্ষা করার দায়িত্ব পুরুষ সহকর্মীদেরই। কলেজে কলেজে পুলিশ বসানো যায় না। কিছু বিকৃত মনের লোক এই ধরনের অপরাধ করে। এদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।” তাঁর এই মন্তব্যের প্রেক্ষিতে প্রশ্ন উঠছে, কলেজের নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থা বা কর্তৃপক্ষের গাফিলতি থাকলে তার দায় কে নেবে? যদিও তিনি এও বলেছেন, “মেয়েদেরও উচিত এই ধরনের অপরাধীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো।” তবে এর সঙ্গেই তিনি যোগ করেন, “কিন্তু তাঁরা কাদের সঙ্গে ঘুরছেন, সেই বিষয়েও সতর্ক থাকা উচিত।” এই শেষোক্ত মন্তব্যটি ইতিমধ্যেই বিভিন্ন মহলে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে।

সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “সরকারি কলেজ হলেও, কর্তৃপক্ষের দিক থেকে কোনও গাফিলতি থাকলে সেটাও খতিয়ে দেখা উচিত।”

মূল অভিযুক্তের TMC-যোগ এবং তার ভূমিকা:

গণধর্ষণের ঘটনায় মূল অভিযুক্ত মনোজিত মিশ্রের ফেসবুক প্রোফাইল থেকে তার তৃণমূল ছাত্র পরিষদের সঙ্গে গভীর সংযোগের প্রমাণ মিলেছে। তার প্রোফাইলে ‘সাংগঠনিক সম্পাদক, দক্ষিণ কলকাতা জেলা তৃণমূল ছাত্র পরিষদ’ লেখা আছে। একসময় সে কলেজের টিএমসিপি ইউনিটের ‘প্রেসিডেন্ট’ও ছিল। তার ফেসবুক প্রোফাইলে তৃণমূলের একাধিক শীর্ষ নেতার সঙ্গে ছবি এবং বিভিন্ন দলীয় অনুষ্ঠান ও সমাজসেবার ছবি দেখা যাচ্ছে।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বুধবার সন্ধ্যায় নির্যাতিতা ছাত্রী কলেজের ইউনিয়ন রুমের পাশে থাকা একটি টয়লেটে যান। সেখানেই প্রথম তাঁর উপর হামলা চালানো হয়। এরপর তাঁকে পাশের ঘরে টেনে নিয়ে যায় অভিযুক্তরা। মনোজিত ছাড়াও এই ঘটনায় জায়েব আহমেদ ও প্রমিত মুখোপাধ্যায় নামের আরও দু’জন জড়িত বলে অভিযোগ।

মনোজিত মিশ্র ওই কলেজের প্রাক্তন ছাত্র হলেও, সে নিয়মিত কলেজে যাতায়াত করত। এমনকি কলেজ পরিচালন কমিটির সুপারিশে তাকে অস্থায়ী কর্মী হিসেবেও নিয়োগ করা হয়েছিল বলে খবর। কলেজে সে রীতিমতো পরিচিত মুখ ছিল।

তদন্তের অগ্রগতি:

কসবা থানার পুলিশ এই ঘটনায় এখনও পর্যন্ত তিনজনকে গ্রেফতার করেছে। তালবাগান ক্রসিং থেকে দু’জনকে এবং একজনকে তার বাড়ি থেকে ধরা হয়। অভিযুক্তদের মোবাইল ফোন বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। আজ, শুক্রবার তাদের আলিপুর আদালতে তোলা হয়েছে এবং পুলিশ তাদের নিজেদের হেফাজতে নেওয়ার আবেদন জানিয়েছে।

এই ঘটনার তদন্তে নেমেছে ফরেন্সিক টিমও। ঘটনাস্থল কর্ডন করে দেওয়া হয়েছে এবং নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে। কলেজের সিসিটিভি ফুটেজও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। জানা গেছে, অভিযুক্তদের মোবাইলের লোকেশন ডেটা এবং কল রেকর্ড বিশ্লেষণ করে ঘটনার দিন তাদের গতিবিধি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হবে।

পুলিশের তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, ঘটনার সময় কলেজে কারা উপস্থিত ছিলেন, এবং নিরাপত্তার দায়িত্বে কারা ছিলেন— এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হচ্ছে। প্রয়োজনে কলেজ কর্তৃপক্ষকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে বলে জানানো হয়েছে। এই নৃশংস ঘটনায় ন্যায়বিচারের আশায় তাকিয়ে আছে রাজ্যবাসী।