গণধর্ষণের অভিযুক্ত, কে এই মনোজিত্? জেনেনিন সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইল থেকে যা জানা গেল…?

কলকাতার বুকে আরও এক কলঙ্ক! কসবার আইন কলেজে ছাত্রীকে গণধর্ষণের ঘটনায় শুধু তীব্র চাঞ্চল্যই সৃষ্টি হয়নি, বরং মূল অভিযুক্তের পরিচয় সামনে আসতেই রাজ্যজুড়ে বইছে সমালোচনার ঝড়। জানা গেছে, এই পাশবিকতার অন্যতম অভিযুক্ত, কলেজের প্রাক্তন ছাত্র মনোজিৎ মিশ্র একজন ‘দাপুটে’ তৃণমূল যুব নেতা। ক্ষমতা ও রাজনৈতিক প্রভাবের আড়ালে কি এই নৃশংস ঘটনা ঘটানোর সাহস পেয়েছিল সে? এই প্রশ্নই এখন জোরালো হচ্ছে।
এই ঘটনায় ইতিমধ্যেই ৩ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তাদের মধ্যে ১৯ বছর বয়সী জাইব আহমেদ এবং ২০ বছর বয়সী প্রমিত মুখোপাধ্যায় ওই কলেজের বর্তমান ছাত্র। তবে তৃতীয় জন, ৩১ বছর বয়সী মনোজিৎ মিশ্র কসবা ল’কলেজেরই প্রাক্তন ছাত্র। মনোজিতের ফেসবুক প্রোফাইলে সগর্বে নিজেকে তৃণমূলের যুব নেতা বলে পরিচয় দিয়েছে। শুধু তাই নয়, দলের একাধিক প্রথম সারির নেতার সঙ্গে তার ছবিও জ্বলজ্বল করছে প্রোফাইলে, যা তার রাজনৈতিক প্রভাবের ইঙ্গিত দেয়।
আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, এই ভয়াবহ ঘটনার দিন অর্থাৎ গত ২৫ জুনই দক্ষিণ কলকাতা যুব তৃণমূল কংগ্রেস সভাপতি নির্বাচনে জয়ের উদযাপন অনুষ্ঠান ছিল। যিনি সভাপতি পদে নির্বাচিত হয়েছেন, তাঁকে অভিনন্দন জানাতে ওই অনুষ্ঠানে সশরীরে হাজির ছিল মনোজিৎ। তার সঙ্গে উপস্থিত ছিল ল’কলেজের TMCP ইউনিটের আরও বহু ছাত্রছাত্রী। আর অভিযোগ উঠেছে, ওই দিনই সন্ধ্যায় ল’কলেজের অভ্যন্তরে এই মারাত্মক ঘটনাটি ঘটে। তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন, ওই অনুষ্ঠানে নিগৃহীতা ছাত্রীও উপস্থিত ছিলেন কি না।
ওই অনুষ্ঠানের পরই নিজের প্রোফাইল পিকচার বদলে ফেলে মনোজিৎ মিশ্র। তার ফেসবুক প্রোফাইল থেকেই স্পষ্ট যে সে কতটা ‘দাপুটে’ ছাত্র নেতা ছিল। মনোজিৎ নিজেই নিজের ফেসবুকে উল্লেখ করে রেখেছে, ২০১৭ সালে সাউথ ক্যালকাটা ল’কলেজের TMCP ইউনিটে সে প্রথম যোগদান করে। এরপর ২০২০ সালে সে দক্ষিণ কলকাতা জেলা তৃণমূল ছাত্র পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক পদের দায়িত্ব পায়। দীর্ঘদিন ধরেই দলের ছাত্র পরিষদের সদস্য এই মনোজিতের কলেজ ক্যাম্পাসে দাপট কম ছিল না। কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল জানিয়েছেন, সম্প্রতি গভর্নিং বডির সুপারিশে স্টাফ হিসেবেও মনোজিৎ সাউথ ক্যালকাটা ল’কলেজে যোগ দিয়েছিল, যা তার প্রভাবকে আরও বাড়িয়ে তুলেছিল। তার নামে কলেজের দেওয়ালে ‘মনোজিৎ দাদা ইউ আর ইন আওয়ার হার্টস’ লেখা দেওয়াল লিখনও তার প্রভাবের সাক্ষ্য দেয়।
পুলিশ সূত্রে খবর, এই পাশবিক ঘটনার নেপথ্যে ছিল এক ভয়ঙ্কর প্রতিহিংসা। অভিযুক্ত মনোজিৎ নাকি ছাত্রীকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু ছাত্রী তার বর্তমান প্রেমের সম্পর্কের কারণে সেই প্রস্তাব পত্রপাঠ খারিজ করে দেয়। এতেই ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে মনোজিৎ। অভিযোগ, সে ছাত্রীর প্রেমিককে খুনের হুমকি দেয় এবং তার বাবা-মাকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে গ্রেফতারের ভয়ও দেখায়।
অভিযোগপত্রে ছাত্রী আরও দাবি করেছেন যে, তাকে জোর করে কলেজের একটি রুমে আটকে রাখা হয় এবং তারপরেই তার ওপর পাশবিক নির্যাতন চালানো হয়। এই বর্বরোচিত ঘটনা কলেজেরই নিরাপত্তারক্ষীর গার্ড রুমে ঘটেছে বলে অভিযোগ। নির্যাতিতা আরও দাবি করেছেন, ধর্ষণের ঘটনা মোবাইল ফোনে রেকর্ড করা হয়েছে এবং অভিযুক্ত হুমকি দিয়েছে যে, এই ঘটনা কাউকে জানালে সেই ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়া হবে।
আরজি করের রেশ কাটতে না কাটতেই নতুন আঘাত: আইন-শৃঙ্খলা প্রশ্নের মুখে
গত বছর ৯ অগাস্ট আরজি কর হাসপাতালে এক তরুণী চিকিৎসককে ধর্ষণ-খুনের ঘটনায় উত্তাল হয়েছিল গোটা দেশ। সেই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই এবার খাস কলকাতার শিক্ষাঙ্গনে এমন বর্বরোচিত ঘটনা – তাও একজন ‘দাপুটে’ রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে। এই ধরনের ধারাবাহিক ঘটনা রাজ্যজুড়ে নারী সুরক্ষা এবং শিক্ষাঙ্গনের নিরাপত্তা নিয়ে ফের এক গভীর প্রশ্নচিহ্ন তুলে ধরেছে নানা মহলে। অভিযুক্তের রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপই কেবল রাজ্যের মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে।