“আধুনিক ড্রোনকে আরও নীরব করার সূত্র ভিঞ্চির নকশায়”-জেনেনিন কি বলছে গবেষকরা?

রেনেসাঁ যুগের ইতালীয় মহাপ্রতিভা লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি, যিনি ‘মোনা লিসা’ ও ‘দ্য লাস্ট সাপার’-এর মতো অমর চিত্রকর্মের জন্য বিখ্যাত, ৫০০ বছর আগে যে হেলিকপ্টার সদৃশ উড়ুক্কু যন্ত্রের নকশা করেছিলেন, তা আধুনিক ড্রোনের শব্দ দূষণ কমাতে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখতে পারে বলে সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দাবি করেছেন বিজ্ঞানীরা। এই আবিষ্কার প্রযুক্তি এবং ইতিহাসের এক অসাধারণ মেলবন্ধন ঘটিয়েছে।

ড্রোন এবং শব্দ দূষণ: এক ক্রমবর্ধমান সমস্যা

বর্তমান বিশ্বে ড্রোন দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে। প্যাকেট সরবরাহ, ছবি তোলা, জরুরি সেবা দেওয়া এমনকি সামরিক কাজেও এর ব্যবহার বাড়ছে। কিন্তু এই ক্রমবর্ধমান ব্যবহারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ছে ড্রোনের শব্দ দূষণ। ব্রিটিশ দৈনিক ইন্ডিপেন্ডেন্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ড্রোন যখন বাতাসে ওড়ে, তখন এর প্রপেলার বা ঘূর্ণায়মান পাখা থেকে এক ধরনের জোরালো শব্দ তৈরি হয়, যা পরিবেশ ও জনজীবনের জন্য এক নতুন সমস্যা তৈরি করছে।

দ্য ভিঞ্চির ‘এরিয়াল স্ক্রু’: সমাধানের পথ?

জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির নতুন গবেষণায় বলা হয়েছে, দ্য ভিঞ্চি প্রায় ৫০০ বছর আগে যে যন্ত্রটির ধারণা দিয়েছিলেন – ‘এরিয়াল স্ক্রু’ – সেটিই হয়তো আরও কম শব্দ তৈরি করে এমন ড্রোন প্রযুক্তি তৈরির মূল চাবিকাঠি হতে পারে। এটি ছিল হেলিকপ্টারের আদিম রূপ বা প্রোটোটাইপ।

১৫শ শতকে দ্য ভিঞ্চির কল্পনা করা ‘এরিয়াল স্ক্রু’ এমন এক প্রাচীনতম নকশা, যা বাতাসে ভেসে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় ওঠার শক্তি তৈরি করতে পারত। এটি ছিল ঘূর্ণায়মান পাখা বা রোটরের এক প্রাথমিক ধারণা।

গবেষণার নেপথ্যে: নীরব ড্রোন তৈরির প্রেরণা

এই গবেষণার লেখক এবং জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক রাজাত মিত্তাল বলেছেন, এই প্রাচীন যন্ত্রের বায়ুগতিগত (aerodynamic) ও শব্দ সম্পর্কিত কার্যকারিতা নিয়ে এখনও খুব কম বৈজ্ঞানিক গবেষণা হয়েছে। ড. মিত্তাল এবং তার দল দ্য ভিঞ্চির ‘এরিয়াল স্ক্রু’ নকশার আধুনিক রূপের বায়ুগতিগত শক্তি ও শব্দ উৎপাদনের মাত্রার কম্পিউটার সিমুলেশন চালিয়েছেন।

ড. মিত্তাল বলেছেন, “দ্য ভিঞ্চির দৃষ্টিদীপ্ত এরিয়াল স্ক্রু, যেটি আধুনিক হেলিকপ্টারেরও আগের তৈরি এক ধারণা – আমাদের গবেষণার মূল অনুপ্রেরণা।” তিনি আরও বলেন, “আমাদের ধারণাটি ছিল ইতিহাস থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে আধুনিক কম্পিউটার প্রযুক্তি ব্যবহার করে এমন ড্রোন তৈরি করা, যা অনেক কম শব্দ তৈরি করবে।”

শব্দ কমানোর রহস্য: স্পাইরাল আকৃতিতে?

আধুনিক ড্রোনের শব্দ সাধারণত প্রপেলারের অগ্রভাগে বাতাসের ঘূর্ণায়মান ধারা বা ‘এয়ার ভর্টেক্স’ তৈরি হওয়ার কারণে হয়। ওই ঘূর্ণায়মান বাতাস প্রপেলারের পাতলা ও ঢালে থাকা পাখার সঙ্গে ধাক্কার ফলে শব্দ তৈরি হয়। বাতাসের গতিবিধি এবং প্রপেলারের আকৃতি ও চলাচলই ড্রোনের শব্দের প্রধান কারণ।

গবেষকরা বলছেন, দ্য ভিঞ্চির নকশার মতো স্ক্রু আকৃতির এবং একটি পাখা বিশিষ্ট প্রপেলার বাতাসের ঘূর্ণিকে আশপাশে ছড়িয়ে দিতে পারে, যার ফলে ড্রোনে শব্দ কম হতে পারে। কম্পিউটার সিমুলেশন চালিয়ে বিজ্ঞানীরা এই বিষয়টি পরীক্ষা করেছেন, যেখানে বিভিন্ন বাতাসের গতির মধ্যে ওই নকশার ওঠার শক্তি, যান্ত্রিক শক্তি ও শব্দ বেরিয়ে আসার মাত্রা কেমন হয় তা খতিয়ে দেখা হয়েছে।

গবেষকরা তাদের প্রাপ্ত ফলাফল প্রচলিত দুই পাখাওয়ালা প্রপেলারের সঙ্গে তুলনা করেছেন, যেটি বাতাসে প্রায় একই পরিমাণ ওঠার শক্তি তৈরি করে। এর মাধ্যমে তারা দেখেছেন, কোন নকশা বেশি কার্যকর ও কম শব্দ তৈরি করে। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, আধুনিকভাবে তৈরি দ্য ভিঞ্চির নকশা একই পরিমাণ ওঠার শক্তি তৈরি করলেও অনেক কম শব্দ তৈরি করেছে।

গবেষণাটিতে গবেষকরা লিখেছেন, “দ্য ভিঞ্চির এরিয়াল স্ক্রু প্রতি একক ওঠার শক্তির জন্য অনেক কম যান্ত্রিক শক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি কম শব্দও তৈরি করে।” তারা ব্যাখ্যা করেছেন, “এরিয়াল স্ক্রুর একটি ধারাবাহিক একক পাখার ডিজাইন থাকার কারণে তা প্রপেলার ও বাতাসের ঘূর্ণির মধ্যে সংঘর্ষ থেকে যে শব্দ তৈরি হয় তা অনেক কমিয়ে দেয়, যা রোটরের শব্দের প্রধান কারণ।”

গবেষকদের মতে, এই ফলাফল ইঙ্গিত দেয় যে, সাধারণ রোটরের বাইরে নতুন ধরনের বিভিন্ন নকশা ড্রোনের শব্দ কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, বিশেষ করে যেখানে শব্দের মাত্রা কম থাকা অত্যন্ত জরুরি। দ্য ভিঞ্চির ৫০০ বছরের পুরোনো এই ধারণা আধুনিক ড্রোন প্রযুক্তিকে কীভাবে প্রভাবিত করে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।