রাজস্থানে ‘বাংলাদেশি’ তকমা দিয়ে বাঙালি শ্রমিকদের আটক, মুখ্যমন্ত্রীর ক্ষোভ, প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ দাবি

রাজস্থানের জেলে উত্তর দিনাজপুরের ইটাহারের প্রায় তিন-চারশো শ্রমিককে ‘বাংলাদেশি’ তকমা দিয়ে আটকে রাখার অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনা নিয়ে মঙ্গলবার সরব হয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বিষয়টি সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নজরে আনার এবং তাঁর সঙ্গে কথা বলার ইচ্ছাপ্রকাশ করেছেন।
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মনে করেন, প্রধানমন্ত্রী এই বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন। তিনি বলেন, “আমি বিষয়টিকে প্রধানমন্ত্রীর নজরে আনার চেষ্টা করব।”, “প্রয়োজনে এই নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গেও কথা বলতে চাই।” একই সঙ্গে তিনি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যসচিব মনোজ পন্থকে রাজস্থানের মুখ্যসচিবের সঙ্গে কথা বলার নির্দেশ দিয়েছেন।
দেশের একাধিক রাজ্যে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। অভিযোগ উঠেছে, এই প্রক্রিয়ার আড়ালে পশ্চিমবঙ্গের নিরীহ বাসিন্দাদেরও ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ বলে দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ইটাহারের শ্রমিকদের ঘটনাটি জানতে পেরেই মুখ্যমন্ত্রী তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
মুখ্যমন্ত্রী এদিন বিধানসভায় বলেন, “ভারত একটা বড় দেশ। এখানে বিভিন্ন ভাষার লোক বাস করেন। কিন্তু বিজেপি এখন ভাষার রাজনীতিও করছে। তারা এমনিতেই বাংলার বিরুদ্ধে। কেন জানি না? কিন্তু বাংলার যারা পরিযায়ী শ্রমিক, তাঁদের দক্ষতা এবং স্কিলের কারণে বিভিন্ন রাজ্যের মানুষ এঁদের নিয়ে যান। বাংলায় কথা বলার জন্য এঁদের বাংলাদেশি বলে দেওয়া হচ্ছে এবং এঁদের বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে।” তিনি জানান, সাম্প্রতিক সময়ে এই ধরনের একাধিক অভিযোগ তাদের কাছে এসেছে এবং তারা পদক্ষেপ করেছেন।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রশ্ন তোলেন, “দেশে এটা কী হচ্ছে? তাঁদের সমস্ত পরিচয়পত্র রয়েছে। তাঁরা বাংলাদেশি নন। তাঁরা এই বাংলার মানুষ। শুধুমাত্র বাংলা ভাষায় কথা বলার জন্য কাউকে কীভাবে বাংলাদেশি বলে আটকে রাখা যায়?” তিনি আরও যোগ করেন, “বাংলাদেশের মানুষ বাংলায় কথা বলেন, এটা কি আমাদের অপরাধ? ভারতবর্ষে বিভিন্ন ভাষায় মানুষ কথা বলেন। তার মানে তাঁরা অন্য দেশের বাসিন্দা! এটা তো হতে পারে না।”
মুখ্যমন্ত্রী উল্লেখ করেন, পশ্চিমবঙ্গে দেড় কোটির বেশি পরিযায়ী শ্রমিক আছেন, যাঁরা অন্য রাজ্যের বাসিন্দা, কিন্তু তাঁদের সঙ্গে কোনো দুর্ব্যবহার করা হয় না। তিনি উষ্মা প্রকাশ করে বলেন, “বিজেপি শাসিত রাজ্যে কেন বারবার এই ধরনের ঘটনাগুলি ঘটছে? ভুলে গেলে চলবে না বাংলা দেশের অন্যতম অফিশিয়াল ভাষার মধ্যে একটা। সেখানে বাংলায় কথা বললে কীভাবে পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দাদের বাংলাদেশি তকমা দেওয়া যেতে পারে?” তিনি আরও জানান, ‘পুশব্যাক’-এর ঘটনা শুধুমাত্র ভারতের দিক থেকেই হচ্ছে, বাংলাদেশের দিক থেকে নয়।
রাজস্থানে বাঙালি শ্রমিকদের আটকের ঘটনা কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক এবং ভাষাভিত্তিক বিভাজনের রাজনীতিকে নতুন করে সামনে এনেছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দ্রুত পদক্ষেপের পর এই বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিক্রিয়া কী হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
বিশ্লেষণমূলক সংবাদ প্রতিবেদন
রাজস্থানে বাঙালি শ্রমিকের আটকের ঘটনা: ‘ভাষার রাজনীতি’ ও পরিচয়ের সংকট; কেন্দ্রের হস্তক্ষেপ চাইছেন মুখ্যমন্ত্রী
রাজস্থানের জেলে উত্তর দিনাজপুরের ইটাহারের তিন-চারশো বাঙালি শ্রমিককে ‘বাংলাদেশি’ আখ্যা দিয়ে আটকে রাখার অভিযোগটি কেবল একটি আইন-শৃঙ্খলাজনিত ঘটনা নয়, বরং এটি ভারতের অভ্যন্তরীণ পরিযায়ী শ্রমিকদের পরিচয় সংকট এবং ‘ভাষার রাজনীতি’র এক গভীর চিত্র তুলে ধরেছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই বিষয়ে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চাওয়ার সিদ্ধান্ত, ঘটনাটির গুরুত্ব এবং এর সম্ভাব্য রাজনৈতিক প্রভাবকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্ট অভিযোগ করেছেন যে, বিজেপি ‘ভাষার রাজনীতি’ করছে এবং শুধুমাত্র বাংলায় কথা বলার কারণেই পশ্চিমবঙ্গের পরিযায়ী শ্রমিকদের ‘বাংলাদেশি’ বলে দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এই অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর, কারণ ভারত একটি বহুভাষিক দেশ এবং সংবিধান প্রত্যেক নাগরিককে তার নিজস্ব ভাষায় কথা বলার অধিকার দিয়েছে। যদি ভাষাভিত্তিক পরিচয়ই নাগরিকত্ব নির্ধারণের মাপকাঠি হয়, তবে তা দেশের ঐক্য ও সংহতির জন্য এক বড় হুমকি। পরিযায়ী শ্রমিকরা, যারা দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকা শক্তি, তাদের এমন হয়রানি তাদের অধিকারের স্পষ্ট লঙ্ঘন।
রাজস্থানে এই ঘটনা ঘটা এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চাওয়া, কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের দীর্ঘদিনের টানাপোড়েনকে আবারও সামনে এনেছে। মুখ্যমন্ত্রী বিশ্বাস করেন যে, প্রধানমন্ত্রী এই বিষয়ে অবগত নন, তাই তিনি ব্যক্তিগতভাবে বিষয়টি তাঁর নজরে আনতে চান। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যসচিবকে রাজস্থানের মুখ্যসচিবের সঙ্গে কথা বলার নির্দেশ দিয়ে তিনি সমস্যা সমাধানের প্রশাসনিক পথও খুলেছেন। তবে, এই ঘটনাটির সবচেয়ে মর্মান্তিক দিক হলো এর মানবিক বিপর্যয়। জীবিকার তাগিদে অন্য রাজ্যে যাওয়া নিরীহ শ্রমিকদের ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ তকমা দিয়ে আটকে রাখা, তাদের পরিবারের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তোলে।
মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ যে, ‘পুশব্যাক’ (অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো) কেবল ভারতের দিক থেকেই হচ্ছে, বাংলাদেশের দিক থেকে নয়, এটি সীমান্ত সুরক্ষা এবং অনুপ্রবেশ নীতি নিয়ে এক বড় বিতর্ক উস্কে দিয়েছে। বিজেপির বিরুদ্ধে ‘বাংলার বিরুদ্ধে’ হওয়ার এবং ‘পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দাদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ’ করার অভিযোগ তুলে মুখ্যমন্ত্রী এই ঘটনার একটি রাজনৈতিক দিকও তুলে ধরেছেন। তার মতে, বাংলা দেশের অন্যতম সরকারি ভাষা হওয়া সত্ত্বেও কেন বাংলাভাষীদের এমন সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে, তা অবোধ্য।
রাজস্থানে বাঙালি শ্রমিকদের আটকের ঘটনাটি কেবল একটি আঞ্চলিক সমস্যা নয়, এটি ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে পরিচয়, ভাষা এবং পরিযায়ী শ্রমিকদের অধিকারের এক জটিল প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দ্রুত এবং জোরালো প্রতিক্রিয়া এই ঘটনাকে জাতীয় বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে এনেছে। এখন দেখার বিষয়, প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপের পর এই সমস্যার দ্রুত সমাধান হয় কিনা এবং কীভাবে ভবিষ্যতে ভাষার ভিত্তিতে নাগরিকদের প্রতি এই ধরনের বৈষম্যমূলক আচরণ বন্ধ করা যায়। এই ঘটনাটি দেশের বৈচিত্র্য ও ঐক্যের ধারণাকে পুনরায় পরীক্ষা করার এক সুযোগ এনে দিয়েছে।