“ওদের আনন্দের জন্য আমার মেয়েকে মেরে দেবে?”-কালীগঞ্জে নাবালিকার মৃত্যুতে শোকে কাতর মা

উপনির্বাচনে তৃণমূলের বিজয় মিছিলের সময় ছোড়া বোমার আঘাতে ৯ বছরের নাবালিকা তমান্না খাতুনের মৃত্যুর ঘটনায় তোলপাড় রাজ্য রাজনীতি। কন্যা হারা শোকে কাতর মা এখন সিবিআই তদন্তের দাবি তুলেছেন, যেখানে স্থানীয় পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ঘটনাটি ঘটেছে সোমবার, কালীগঞ্জে উপনির্বাচনে তৃণমূল প্রার্থী আলিফা খাতুনের জয়ের পর বিজয় উদযাপনের সময়।

তমান্না খাতুনের মা-এর অভিযোগ, শুধুমাত্র সিপিআইএম-কে ভোট দেওয়ার কারণেই তাঁদের বাড়িতে ইচ্ছাকৃতভাবে হামলা চালানো হয়েছিল এবং তাঁর মেয়েকে হত্যা করা হয়েছে। তিনি বারবার করে দাবি করছেন, এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং পরিকল্পিত হামলা। শোকস্তব্ধ মায়ের প্রশ্ন, “উৎসব করে কি মানুষ মেরে দেবে? ওদের আনন্দের জন্য আমার কোল খালি করে দেবে?”

ঘটনার পর কৃষ্ণনগর পুলিশ জেলার এসপি নিহত নাবালিকার পরিবারের সঙ্গে দেখা করে দ্রুত অভিযুক্তদের গ্রেফতারের আশ্বাস দেন। তবে তমান্নার বাবা ক্ষোভের সঙ্গে এসপিকে বলেন, “কোনও গ্রেফতার করতে পারবেন না আপনারা।” এই মন্তব্য পুলিশের প্রতি তাঁদের আস্থাহীনতারই ইঙ্গিত দেয়।

এসপি অবশ্য এই ঘটনাকে ‘দুর্ঘটনা’ বলে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর দাবি, বাড়ির দেওয়ালে যে স্প্লিন্টারের চিহ্ন মিলেছে, তা “দুর্ঘটনা বশত ছিটকে এসে পড়েছে।” কিন্তু নিহত নাবালিকার মা এই তত্ত্ব সম্পূর্ণভাবে খারিজ করে দিয়েছেন। তাঁর দাবি, “আমরা সিপিআইএম পার্টিকে ভোট দিই সে কারণে ইচ্ছে করে বোমা ছোড়া হয়েছে বাড়িতে। সিবিআই এসে তদন্ত করুক। আমার মেয়ের জামা ছিঁড়ে গিয়েছিল। আমি ওর দেহ তুলতে পারছিলাম না।”

তমান্নার মা কাঁদতে কাঁদতে বলেন, “আমার মেয়ে হাত ছেড়ে কোথাও যায় না। খেলতেও যায় না। আমার হাতে মাথা দিয়ে ঘুমোয়। আজও আমার হাত ধরে যাচ্ছিল। হঠাৎ আওয়াজ শোনা গেল। মেয়েটা আমার হাত ছেড়ে একদিকে পড়ল, আমিও একদিকে পড়ে গেলাম। উঠে দেখি আমার একদিকটা জ্বলছে। তারপরই দেখি তমান্না পড়ে আছে।” স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, শুধু তমান্নার বাড়িতেই নয়, এলাকার অন্যান্য বাম সমর্থকের বাড়িতেও পরপর বোমা ছোড়া হয়েছিল।

এই মর্মান্তিক ঘটনায় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও বিস্মিত হয়েছেন। তিনি পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে অবিলম্বে দোষীদের গ্রেফতারের নির্দেশ দিয়েছেন।

এদিকে, তৃণমূলের পক্ষ থেকে এই ঘটনার পেছনে ‘অন্য উদ্দেশ্য’ থাকার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। তৃণমূল নেতা কুণাল ঘোষ বলেছেন, “কেউ অতি উৎসাহী হয়ে এই কাজ করল নাকি কেউ তৃণমূলের ভাল ফলের পর দলকে কালিমালিপ্ত করার জন্য এই কাজ করল সেটা দেখতে হবে।” তাঁর এই মন্তব্য ঘটনাটিকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে এবং রাজনৈতিক তরজা বাড়িয়েছে।

তমান্না খাতুনের এই অকাল মৃত্যু রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা এবং নির্বাচন-পরবর্তী হিংসা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে। সিপিআইএম সমর্থকদের বাড়িতে হামলার অভিযোগ এবং সিবিআই তদন্তের দাবি এই ঘটনাকে আরও গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, এই ঘটনার প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন হয় কিনা এবং দোষীরা শাস্তি পায় কিনা।