‘দাদা, পিছন দিকে এগিয়ে যান’—বাসের আকালে টোটো নির্ভরতা, পকেট খালি হচ্ছে যাত্রীদের!

হাওড়ার গণপরিবহণের হাল এখন মিনিবাসের কন্ডাক্টরের সেই চিরচেনা সংলাপের মতোই—’দাদা, পিছন দিকে এগিয়ে যান!’ যত দিন যাচ্ছে, হাওড়া শহরে বাসের সংখ্যা কমছে, বিশেষ করে রাতের বেলায় বহু রুটে বাস প্রায় দেখাই যায় না। ভরসা একমাত্র টোটো। এর ফলে একদিকে যেমন সাধারণ মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে, তেমনই অতিরিক্ত ভাড়া গুনে পকেট খালি হচ্ছে যাত্রীদের।

হাওড়ার বামুনগাছির বাসিন্দা দীপান্বিতা বোস সল্টলেকের তথ্য-প্রযুক্তি সংস্থায় কাজ করেন। প্রতিদিনের যাত্রী তিনি। অফিস থেকে বাড়ি ফিরতে প্রায়ই রাত ১০টা বেজে যায়। তিনি জানান, বিধাননগর থেকে হাওড়া স্টেশন পর্যন্ত আসতে খুব একটা সমস্যা হয় না, কিন্তু বাকি পথটাই তাঁর কাছে প্রতিদিনের ‘হ্যাপা’। দীপান্বিতার কথায়, “বেশিরভাগ দিন আমি যখন রাতে অফিস থেকে বাড়ি ফিরি, তখন ৫৭ রুটের বাস থাকে না। তাই বাধ্য হয়ে, বেশি ভাড়া দিয়ে, টোটো বুক করে অথবা দুটো অটো বদলে বাড়ি ফিরি।” দীপান্বিতার এই ভোগান্তি হাওড়ার অসংখ্য মানুষের নিত্যদিনের চিত্র।

সঙ্কটজনক হাওড়ার যোগাযোগ ব্যবস্থা: বাস মালিকদের কাঁধে টোটো ‘ভিলেন’
একটি শহরের উন্নতি তার যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে। সেদিক থেকে বিচার করলে, হাওড়া শহরের অবস্থা রীতিমতো সঙ্কটজনক। বাস মালিকরা জানাচ্ছেন, হাওড়া শহরের প্রায় ১০-১৫টি রুটে বাস পরিষেবা কার্যত মুখ থুবড়ে পড়েছে। প্রতিটি রুটেই বাসের সংখ্যা কমতে কমতে তলানিতে এসে ঠেকেছে। পুরোনো হয়ে যাওয়ায় অনেক বাস বসিয়ে দিতে হয়েছে। আবার কোনো কোনো রুটে যাত্রীর সংখ্যা কমে যাওয়ায় লোকসানের ঠেলায় মালিকরা বাস বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছেন। বাসের ব্যবসা মার খাওয়ার জন্য বাস মালিকরা সরাসরি টোটোকেই ‘ভিলেন’ হিসেবে দেখছেন।

বাস মালিকদের দাবি, বালি ও শিবপুরে জিটি রোড, পঞ্চাননতলা রোড, নেতাজি সুভাষ রোডে টোটোর সংখ্যা অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ায় ৫১, ৫২, ৫৪ ও ৫৫ নম্বর রুটে বাসে আগের মতো যাত্রী হচ্ছে না। ৫১ নম্বর রুটের বাস মালিক নিখিল হাজরার দাবি, “টোটো বাসের ব্যবসার খুবই ক্ষতি করছে। টোটো অলিতে-গলিতে ঢুকে যাচ্ছে। ফলে, একটু ভাড়া বেশি লাগলেও, প্যাসেঞ্জাররা যাতায়াতের জন্য টোটোকেই বেছে নিচ্ছেন।”

রুট বন্ধ, সংখ্যা তলানিতে: কিছু গুরুত্বপূর্ণ রুটের চিত্র
পরিবহণ দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, হাওড়া স্টেশন থেকে পার ডানকুনি পর্যন্ত কোভিডের আগে প্রায় ১২টি বাস চলত, বর্তমানে মাত্র ৩টি চলে। বালিখাল থেকে সালকিয়া ও হাওড়ার দিকে ৫৪ নম্বর রুটের বাস রাত্রি আটটার পর বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মানুষকে টোটো ও অটোর ওপর নির্ভর করতে হয়। আগে হাওড়া স্টেশন থেকে রিষড়া পর্যন্ত একটি বাস রুট (৫৪/২) থাকলেও, সেটি এখন পুরোপুরি বন্ধ। ৫৪ নম্বর রুটে বালিখাল থেকে ধর্মতলা পর্যন্ত আগে মোট ৩০টি বাস চলত, এখন সংখ্যাটা নেমেছে ২০-তে।

বেলুড়মঠ ও দক্ষিণেশ্বর যাওয়ার জন্য আগে ৫৬ নম্বর রুটের বাস ব্যবহার হলেও, এখন এই রুটে বাস কমে যাওয়ায় এক ঘণ্টা অন্তর বাস চলে। ফলে যাত্রীরা বাসের জন্য অপেক্ষা করেন না। সম্প্রতি ৮-১০টি নতুন বাস নামলেও তা চাহিদার তুলনায় খুবই কম।

শিবপুরের দিকে যাওয়ার জন্য আগে অধিকাংশ মানুষ ৫৫ ও ৫৫এ রুটের বাসে চড়তেন। কিন্তু এই রুটেও বাসের সংখ্যা তলানিতে—একসময় ২০-২২টি বাস চললেও, এখন মাত্র ৩-৪টি চলে। ৬১এ হাওড়া-আমতা (ভায়া রানিহাটি) রুটটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। হাওড়া স্টেশন থেকে একব্বরপুর যাওয়ার ৬৯ নম্বর রুটে হাতেগোনা কিছু বাস চললেও তারা এখন সাঁকরাইল স্টেশন পর্যন্ত যায়।

রামরাজাতলা থেকে এসপ্ল্যানেড পর্যন্ত ৫২ নম্বর রুটটি প্রায় উঠে যেতে বসেছিল, যদিও শেষ পর্যন্ত মালিকদের চেষ্টায় তা টিকে আছে। শিবপুরের চ্যাটার্জিহাট থেকে ধর্মতলাগামী ৫৮ নম্বর বাস ও আমতলা ও-পি থেকে শ্যামবাজারগামী মিনিবাস পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। ৫৭ নম্বর কোনা-ধর্মতলা রুটে ২০-২২টি বাস চললেও এখন মাত্র ২-৩টি চলে। ৫৭এ রুটে হাওড়া-জগদীশপুরের মধ্যে বর্তমানে ১২টি বাস চললেও ডোমজুড়, শিয়াখালা পর্যন্ত সম্প্রসারিত রুটে কোনো বাস যায় না। কোনা-ধর্মতলা ১৮ নম্বর মিনিবাস চলে মাত্র ৩টি, যেখানে আগে ১০টির মতো চলত।

এছাড়াও, বলুহাটি-ধর্মতলা (রুট-৩০), মাকড়দহ-খিদিরপুর (রুট-৩১), বেলগাছিয়া-সল্টলেক (রুট-১৭), টিকিয়াপাড়া-রাজাবাজার (কে-৬) মিনিবাস রুট পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। হাওড়া ময়দান থেকে বেহালা সখের বাজার ও পর্ণশ্রী রুটও বন্ধের মুখে। হাওড়া ময়দান-সল্টলেক ৭১ নম্বর রুটের বাস এখন রাজাবাজার পর্যন্ত যায়। বাঁধাঘাট থেকে শিয়ালদহগামী ২৪ নম্বর রুটে আগে ২০টির বেশি বাস চললেও এখন চলে ৩-৪টি। ঘুষুড়ির সত্যবালা আই-ডি হাসপাতাল থেকে মধ্য কলকাতা হয়ে কসবা যাওয়ার একমাত্র সংযোগরক্ষাকারী মিনিবাস রুট ১এ-তে সারাদিনে দু-একটি বাস চলে। লিলুয়ার ভট্টনগর থেকে সল্টলেক বাসরুট চালু হলেও সেটাও এখন বন্ধ। হাওড়ার ঘাসবাগান ডিপো থেকে শিয়ালদহের সরকারি সি-২৪ বাস একমাত্র অফিস টাইমেই পাওয়া যায়। ফেরার পথে হাওড়া স্টেশন পর্যন্ত আসায় যাত্রীদের অসুবিধায় পড়তে হয়। হাওড়া ফায়ার সার্ভিস স্টেশন থেকে মুকুন্দপুর যাওয়ার ২৪এ/১ রুটের অধিকাংশ বাসই পুরোনো, কোনো নতুন বাস নামেনি।

দক্ষিণ হাওড়ার শিবপুর ও আন্দুল রোড দিয়ে বিদ্যাসাগর সেতু হয়ে কিছু নতুন বাসরুট চালু হলেও উত্তর হাওড়ার বালি, বেলুড়, সালকিয়া থেকে কলকাতার সংযোগকারী কোনো নতুন বাসরুট চালু হয়নি। বর্তমানে শিবপুরে রাজ্যের মুখ্য প্রশাসনিক কার্যালয় ‘নবান্ন’ হলেও উত্তর হাওড়ার দিক থেকে সরাসরি কোনো যোগাযোগ ব্যবস্থা নেই। এটি দীর্ঘ পাঁচ দশকের দাবি হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। রাত্রি নটার পর হাওড়া স্টেশন ও হাওড়া ময়দান থেকে শিবপুর, কদমতলা, দাশনগর, সালকিয়ায় যাতায়াতের একমাত্র ভরসা টোটো, যেখানে দ্বিগুণ ভাড়া দিয়ে যাতায়াত করতে হয়।

সালকিয়ার বাসিন্দা সুজিত পাল আক্ষেপ করে বলেন, “উত্তর হাওড়ার যাত্রী পরিবহণের দিকে না প্রশাসনের কোনো মাথাব্যথা আছে, না রাজনৈতিক নেতারা এ নিয়ে চিন্তিত। তার ফল ভুগতে হচ্ছে উত্তর হাওড়ার মানুষকে।”

হাওড়ার এই গণপরিবহণ সংকট দ্রুত সমাধান না হলে, দৈনন্দিন যাত্রীদের ভোগান্তি আরও বাড়বে এবং শহরের যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও মুখ থুবড়ে পড়বে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সরকার ও পরিবহণ কর্তৃপক্ষের জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।

তথ্যসূত্র:এই সময়