“বিরোধীদের উপর পেগাসাস, জঙ্গিদের বিরুদ্ধে নয় কেন?”-অভিষেকের ৫টি প্রশ্ন কেন্দ্রকে

২২ এপ্রিল ভূস্বর্গ কাশ্মীরের পহেলগামে জঙ্গিদের হাতে ২৬ জন নিরীহ মানুষের রক্তাক্ত হওয়ার ৫৫ দিন পরেও কোনো আততায়ী ধরা পড়েনি। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন তুলেছেন তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সোমবার (১৬ জুন) X হ্যান্ডলে (সাবেক টুইটার) কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্দেশে পাঁচটি তীক্ষ্ণ প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন তিনি, যা নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক। পহেলগাম হামলার পরও বিশ্বব্যাঙ্কের কাছ থেকে পাকিস্তানের বিশাল অর্থ সাহায্য পাওয়াকে ভারতের ‘কূটনৈতিক ব্যর্থতা’ বলেও আখ্যা দিয়েছেন অভিষেক।
প্রশ্ন ১: নিরাপত্তা ব্যর্থতার দায় কার?
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রথম এবং সবচেয়ে মৌলিক প্রশ্ন, “সীমান্ত টপকে জঙ্গিরা ভারতের মাটিতে ঢুকল, তারপর হামলা চালাল এবং পালিয়ে গেল। কিন্তু কীভাবে তারা ঢুকল?” তিনি এই ‘বিশাল নিরাপত্তা ব্যর্থতা’র জন্য দায়ী কে এবং কে এর জবাবদিহি করবে, তা জানতে চেয়েছেন। এই প্রশ্ন সরাসরি দেশের সীমান্ত সুরক্ষা এবং গোয়েন্দা বিভাগের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
প্রশ্ন ২: গোয়েন্দা ব্যর্থতা কি ‘পুরস্কার’ পেল? পেগাসাস কেন সন্ত্রাসীদের জন্য নয়?
পহেলগামের জঙ্গি হামলাকে অনেকেই গোয়েন্দা ব্যর্থতা বলে মনে করছেন। কিন্তু অভিষেক অবাক হয়েছেন এই ভেবে যে, ঘটনার একমাস পরেই IB প্রধানের এক বছরের মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়েছে। তাঁর প্রশ্ন, “এটা কি ব্যর্থতার পর পুরস্কার—এর কারণ কী? বাধ্যবাধকতা কী?” এরপর তিনি পেগাসাস স্পাইওয়্যারের প্রসঙ্গে বলেছেন, “সরকার যদি PEGASUS স্পাইওয়্যার ব্যবহার করে বিরোধী নেতা (আমিও তার মধ্যে একজন), সাংবাদিক এবং বিচারপতিদের উপর নজরদারি চালাতে পারে, তাহলে সন্ত্রাসবাদী নেটওয়ার্ক ও সন্দেহভাজনদের উপর এই প্রযুক্তি প্রয়োগে বাধা কোথায়?”
প্রশ্ন ৩: পহেলগামের হামলাকারীরা কোথায়?
হামলার প্রায় দুই মাস কাটতে চললেও হামলাকারীরা এখনও অধরা। অভিষেক জানতে চেয়েছেন, “এই নারকীয় হামলার জন্য দায়ী চার সন্ত্রাসবাদী এখন কোথায়? তারা কি মারা গেছে, না বেঁচে আছে? যদি তারা নিহত হয়, তাহলে কেন্দ্রীয় সরকার এই নিয়ে স্পষ্ট বিবৃতি দিচ্ছে না কেন? আর যদি না হয়ে থাকে, তবে চুপ করে বসে আছে কেন?” এই প্রশ্নগুলি সরকার ও নিরাপত্তা বাহিনীর কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর সংশয় তৈরি করছে।
প্রশ্ন ৪: PoK পুনরুদ্ধার কবে? এবং ট্রাম্পের ‘বাণিজ্যিক চুক্তি’তে সংঘর্ষবিরতি?
অপারেশন সিঁদুর ও সন্ত্রাস দমনে ভারতের পদক্ষেপ নিয়ে সর্বদলীয় সংসদীয় দলের প্রতিনিধি হয়ে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া এবং মালয়েশিয়া সফর করেন। সেখানে তিনি প্রতিটি বৈঠক এবং আলোচনাসভাতেই পাকিস্তানের মুখোশ খুলে দেন এবং স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন যে, পাকিস্তানের সঙ্গে এখন শুধুমাত্র পাক-অধিকৃত কাশ্মীর (PoK) নিয়েই কথা হতে পারে। এই সূত্র ধরে তিনি X পোস্টে জানতে চান, “ভারত কবে PoK পুনরুদ্ধার করবে?”
৭ মে পহেলগামের পাল্টা ‘অপারেশন সিঁদুর’ শুরু করেছিল ভারত। ১০ মে সংঘর্ষবিরতি হয়। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, তাঁর কথাতেই দুই দেশ সংঘর্ষবিরতিতে রাজি হয়েছে। অভিষেকের প্রশ্ন, “বাণিজ্যের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সংঘর্ষবিরতি, এই নিয়ে কেন কেন্দ্রীয় সরকার এখনও পর্যন্ত কোনও প্রতিক্রিয়া দেয়নি? সারা দেশ যখন একসঙ্গে দাঁড়িয়েছিল, তখন কেন ভারতবাসীর আবেগকে অবজ্ঞা করা হলো?”
প্রশ্ন ৫: ‘বিশ্বগুরু’র দাবি এবং পাকিস্তানের আন্তর্জাতিক মঞ্চে স্বীকৃতি?
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় সর্বদলীয় সংসদীয় দলের ৩৩টি দেশ সফরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে জানতে চেয়েছেন, “কটি দেশ খোলাখুলিভাবে ভারতের পাশে দাঁড়িয়েছে?” প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ‘বিশ্বগুরু’ হয়ে ওঠার দাবিকে একহাত নিয়ে তিনি বলেছেন, “আমরা যদি সত্যিই বিশ্বগুরু হই, বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি হয়ে থাকি, তাহলে পহেলগামের ঠিক পরেই IMF কীভাবে পাকিস্তানকে ১ বিলিয়ন এবং বিশ্বব্যাঙ্ক ৪০ বিলিয়ন ডলার অর্থ সাহায্য করল? যে দেশ বারবার সীমান্ত পেরিয়ে সন্ত্রাস ছড়ায়, তারা কীভাবে আন্তর্জাতিক মঞ্চে প্রশংসিত ও পুরস্কৃত হয়?”
শেষ টিপ্পনি: ২ লক্ষ কোটি টাকার বিদেশমন্ত্রক বনাম ফলাফল
শেষে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় কেন্দ্রীয় সরকারের গত ১০ বছরে বিদেশমন্ত্রকের পিছনে ২ লক্ষ কোটি টাকা (২,০০,০০০ কোটি) খরচের প্রসঙ্গ টেনে এনেছেন। তিনি বলেছেন, “এই প্রশাসনের থেকে আমরা চাই স্বচ্ছতা, দায়িত্ববোধ আর ফলাফল।”
অভিষেকের এই পাঁচটি প্রশ্ন সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা, গোয়েন্দা সক্ষমতা, কূটনীতি এবং আর্থিক নীতির কার্যকারিতা নিয়ে বড়সড় চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। গোটা দেশ এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানতে চায় বলেই তিনি মন্তব্য করেছেন। এই প্রশ্নের জবাব কেন্দ্রীয় সরকার কীভাবে দেয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।