কেন বিপদে পড়লে ‘মে-ডে’ বলেন পাইলটরা? কী ভাবে শুরু হলো এল এই সংকেতের ব্যবহার?

বৃহস্পতিবার (১২ জুন, ২০২৫) দুপুর ১টা বেজে ৩৯ মিনিটে। আহমেদাবাদের সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে লন্ডনের গ্যাটউইক বিমানবন্দরের উদ্দেশ্যে পাড়ি দিচ্ছিল এয়ার ইন্ডিয়ার বোয়িং ৭৮৭-৮ ড্রিমলাইনার, ফ্লাইট এআই-১৭১। রানওয়ে ২৩ থেকে উড়ান ভরার মাত্র ৫ মিনিটের মধ্যে, ঘটে গেল এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। বিমানটি এক মেডিক্যাল কলেজের হোস্টেলের উপর ভেঙে পড়ল, আর সেই মুহূর্তে এয়ার ট্র্যাফিক কন্ট্রোল (ATC) শুনতে পেল এক চরম বিপদের সংকেত – ‘মে-ডে কল’। ডিজিসিএ নিশ্চিত করেছে, স্বয়ং পাইলট ক্যাপ্টেন সুমিত সাভারওয়াল এই কল করেছিলেন। কিন্তু কী এই ‘মে-ডে’ কল? আর কেনই বা এটি এত গুরুত্বপূর্ণ?

‘মে-ডে’ কল: আন্তর্জাতিক বিপদ সংকেতের উৎস ও গুরুত্ব

‘মে-ডে’ কল হলো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এক বিপদ সংকেত, যা মানুষ আকাশে উড়া শুরুর সময় থেকেই ব্যবহার করে আসছে। এমনকি এরও আগে, জাহাজ ও অন্যান্য জলযানের ক্ষেত্রেও এই সংকেতের ব্যবহার শুরু হয়েছিল। ১৯২৭ সালে আন্তর্জাতিক রেডিও টেলিগ্রাফ কনভেনশনে এই সংকেতকে আদর্শ বিপদ সংকেত হিসেবে গ্রহণ করা হয়। এর আগে, বিপদ সংকেত হিসেবে ‘এসওএস’ শব্দটি ব্যবহার করা হতো, কিন্তু রেডিও সিগনাল দুর্বল হলে অনেক সময় এসওএস স্পষ্ট ভাবে বোঝা যেত না, যা ‘মে-ডে’র প্রয়োজনীয়তা বাড়িয়ে তোলে।

‘মে-ডে’র ফরাসি শিকড়: ‘আমায় সাহায্য করুন’

এই বিশেষ বিপদ সংকেতটির উৎপত্তি ফরাসি শব্দ ‘মাইদের’ (m’aider) থেকে, যার অর্থ ‘আমায় সাহায্য করুন’। জরুরি পরিস্থিতিতে রেডিও সিগনাল দুর্বল থাকলেও যাতে বিপদ এবং জরুরি অবস্থা স্পষ্ট ভাবে বোঝানো যায়, সে কারণেই সাধারণত পরপর তিনবার ‘মে-ডে, মে-ডে, মে-ডে’ বলা হয়।

কারা ‘মে-ডে’ কল করতে পারেন এবং কখন?

জাহাজ হোক বা বিমান, ‘মে-ডে’ কল করার অধিকার কেবল সেই যানের কমান্ডারেরই থাকে – অর্থাৎ, উড়ানের ক্ষেত্রে পাইলট এবং জাহাজের ক্ষেত্রে ক্যাপ্টেন।

এই কল তখনই করা হয় যখন চরম জরুরি অবস্থা দেখা দেয়। এর মধ্যে রয়েছে:

ইঞ্জিন খারাপ হয়ে যাওয়া
আগুনের সূত্রপাত
বিমান বা জাহাজের নিয়ন্ত্রণ হারানো
গুরুত্বপূর্ণ যান্ত্রিক ব্যর্থতা
গুরুতর চিকিৎসাগত জরুরি অবস্থা
বিমান বা জাহাজের নিরাপত্তা বিপন্ন হয় এমন যেকোনো অবস্থা
ফ্লাইট এআই-১৭১-এর ক্ষেত্রে বিমানটি উড়ানের প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ক্যাপ্টেন ‘মে-ডে’ কল করেছিলেন। এর থেকে স্পষ্টতই বোঝা যায়, টেকঅফের পরপরই বিমানটি কোনো গুরুতর এবং অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছিল, যা পাইলটদের জীবন এবং বিমানের নিরাপত্তা নিয়ে চরম সংশয় তৈরি করে।

‘মে-ডে’ কল করার পর কী ঘটে? এক সমন্বিত প্রতিক্রিয়া

‘মে-ডে’ কল পাওয়ার পর, এয়ার ট্র্যাফিক কন্ট্রোল বা বন্দর কর্তৃপক্ষ অবিলম্বে রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি পরিষ্কার করে দেয়। তাদের প্রধান লক্ষ্য থাকে বিপর্যস্ত ফ্লাইট বা জাহাজটির সঙ্গে একচেটিয়াভাবে যোগাযোগ স্থাপন করা।

এরপর পাইলট বা ক্যাপ্টেন বিপদ বা জরুরি অবস্থা সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য প্রদান করেন। এর মধ্যে থাকে: কী ধরনের জরুরি অবস্থা, বিমান বা জাহাজের সঠিক অবস্থান, বিমান হলে তার বর্তমান উচ্চতা, বিমানে বা জাহাজে কতজন লোক আছেন ইত্যাদি। একইসাথে, পাইলট বা ক্যাপ্টেন বিমানবন্দরে ফিরে আসার আগ্রহ প্রকাশ করেন কি না, অথবা জরুরি অবতরণ সম্ভব কি না, সেই তথ্যও জানতে চাওয়া হয়।

এই তথ্যের ভিত্তিতেই জরুরি প্রতিক্রিয়া প্রোটোকল সক্রিয় করা হয়। উদ্ধারকারী দল, অগ্নিনির্বাপক পরিষেবা এবং চিকিৎসা কর্মীদের নিয়ে একটি সমন্বিত প্রতিক্রিয়া দল দ্রুত দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর জন্য প্রস্তুত হয়।

আইনি বাধ্যবাধকতা: সহায়তার ডাক

‘মে-ডে’ কল করা হলে, আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক নিয়ম অনুযায়ী, যে জাহাজ বা বন্দর কর্তৃপক্ষ বা এয়ার ট্র্যাফিক কন্ট্রোল এই কল শুনতে পায়, তাদের কিছু নির্দিষ্ট প্রোটোকল এবং বাধ্যবাধকতা মানতে হয়। এর মধ্যে অন্যতম হলো, সম্ভব হলে বিপদগ্রস্ত জাহাজ বা বিমানটিকে সাহায্য করা। কেউ সক্ষম হয়েও যদি ‘মে-ডে’ কলে সাড়া না দিয়ে সাহায্য না করে, তাহলে তাকে আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়।

এআই-১৭১-এর ক্ষেত্রে ‘মে-ডে’ কলটি ছিল জীবনের জন্য এক শেষ আকুতি। এই কলটিই জানান দিয়েছিল যে, আহমেদাবাদের আকাশে এক ভয়াবহ বিপর্যয় ঘনিয়ে আসছে, যার কারণ এখনও তদন্তাধীন।