“বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ক্ষীণ”, ২০০-র বেশি মৃতদেহ উদ্ধার, আহমেদাবাদে ধ্বংসের আর্তনাদ

গুজরাতের আহমেদাবাদের আকাশ আজ এক ভয়াবহ ট্র্যাজেডির সাক্ষী রইল। বৃহস্পতিবার দুপুরে, যখন জীবন তার স্বাভাবিক ছন্দে বইছিল, তখনই লন্ডনের পথে রওনা দেওয়া এয়ার ইন্ডিয়ার AI 171 বিমানটি এক মুহূর্তের মধ্যে লোকালয়ের বুকে আছড়ে পড়ল, যেন এক জীবন্ত আগুনের গোলা। টেক অফের মাত্র পাঁচ মিনিটের মাথায়, ২৩০ জন যাত্রী এবং ১২ জন কেবিন ক্রু-সহ মোট ২৪২ জন আরোহীকে নিয়ে বিমানটি বিধ্বংসী রূপে ভেঙে পড়ল মেঘানিনগর এলাকার ওপর, ছিনিয়ে নিল অসংখ্য প্রাণ, আর ফেলে গেল এক চিরন্তন শূন্যতা।
আহমেদাবাদের পুলিশ কমিশনার জি.এস. মালিক আজতকের সঙ্গে কথা বলার সময় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর কণ্ঠে স্পষ্ট ছিল এই দুর্ঘটনার নির্মম বাস্তবতা। তিনি বলেন, “দুর্ঘটনার তীব্রতা বিবেচনা করে কারও বেঁচে থাকার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।” এই মুহূর্তে ২০৪টি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, যা দুর্ঘটনাস্থলের বিভীষিকাময় চিত্র তুলে ধরছে। ৪১ জন আহতের চিকিৎসা চলছে, কিন্তু তাদের অবস্থাও অত্যন্ত সঙ্কটজনক। প্রতিটি মুহূর্ত যেন জীবনের সঙ্গে মৃত্যুর এক অসম লড়াই। মালিক আরও বলেন, “উদ্ধার অভিযান চলছে, তবে ধ্বংসাবশেষ এবং আগুনের অবস্থা বিবেচনা করে পরিস্থিতি অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং রয়ে গিয়েছে।”
বিমানটি এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল (এটিসি) কে একটি ‘মেডে কল’ দিয়েছিল, যা শেষ মুহূর্তে প্রাণের জন্য আকুল আবেদন ছিল। কিন্তু বিধির বিধান ছিল ভিন্ন। বিমানবন্দরের বাইরে একটি হাসপাতালের হস্টেলের উপরে বিমানটি প্রথমে আঘাত হানে। জানা গেছে, এটি প্রথমে বিজে মেডিকেল কলেজের মেসে ধাক্কা মারে এবং এরপর অতুল্যম হস্টেলে, যেখানে সিনিয়র রেসিডেন্ট ডাক্তাররা থাকতেন। এক নিমেষে ভেঙে পড়ল স্বপ্ন, সম্ভাবনা, আর অগণিত মানুষের ভবিষ্যৎ। এই দুর্ঘটনার ফলে শুধু বিমানের আরোহীরাই নন, মাটিতে থাকা নিরীহ মানুষজনও এর শিকার হয়েছেন।
দুর্ঘটনার খবর পাওয়ামাত্রই যুদ্ধকালীন তৎপরতায় শুরু হয়েছে উদ্ধারকাজ। ন্যাশনাল ডিজাস্টার রেসপন্স ফোর্সের (এনডিআরএফ) তিনটি দলকে গান্ধীনগর থেকে দ্রুত দুর্ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছে, এবং ভদোদরা থেকে আরও তিনটি দল আসছে। সেনাবাহিনী ও বিমানবাহিনী ৪০টিরও বেশি অ্যাম্বুলেন্স এবং প্রায় ১৩০ জন কর্মীকে মোতায়েন করেছে। একটি সামরিক হাসপাতালকেও প্রস্তুত রাখা হয়েছে, প্রতিটি জীবন বাঁচানোর শেষ চেষ্টা চালিয়ে যেতে। সিআইএসএফও উদ্ধারকাজে হাত লাগিয়েছে, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছে প্রতিটি বাহিনী।
এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার তদন্ত করবে এয়ারক্রাফট অ্যাক্সিডেন্ট ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো (AAIB)। আন্তর্জাতিক সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (FAA)। এক বিবৃতিতে তারা জানিয়েছে, “যখন কোনও আন্তর্জাতিক ঘটনা ঘটে, তখন সেই সরকার তদন্তের নেতৃত্ব দেয়। সহায়তা চাওয়া হলে, NTSB হল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকারী প্রতিনিধি এবং FAA প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করে।” তারা NTSB-এর সঙ্গে সমন্বয় করে অবিলম্বে একটি দল গঠন করতে প্রস্তুত, যাতে এই দুর্ঘটনার কারণ নির্ণয় করা যায় এবং ভবিষ্যতে এমন ট্র্যাজেডি এড়ানো সম্ভব হয়।
আহমেদাবাদের আকাশ আজ কালো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন, কিন্তু তার থেকেও বেশি ভারী হয়ে উঠেছে হাজারো মানুষের হৃদয়ের কান্না আর অনিশ্চয়তা। এই ঘটনা শুধু একটি বিমান দুর্ঘটনা নয়, এটি এক সমষ্টিগত বেদনা, যা দীর্ঘকাল মানুষের স্মৃতিতে এক গভীর ক্ষত রেখে যাবে।