ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি সত্ত্বেও আমেরিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে বিক্ষোভ, বাড়ছে জনতার ভীর

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর অভিবাসন নীতির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে বিক্ষোভ আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। তার হুমকি সত্ত্বেও ওয়াশিংটন ডিসি, নিউইয়র্ক, শিকাগো, লস অ্যাঞ্জেলেসসহ অন্তত এক ডজন বড় শহরে বুধবার হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছেন। এই পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে ক্যালিফোর্নিয়া। বৃহস্পতিবার (১২ জুন) এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি।

বিক্ষোভকারীরা ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে স্বৈরতান্ত্রিক আচরণ, গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব এবং শান্তিপূর্ণ মতপ্রকাশ দমনের অভিযোগ তুলেছেন। ট্রাম্প সম্প্রতি হুঁশিয়ার করে বলেছিলেন, “যদি বিক্ষোভকারীরা সহিংসতা করে, তবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” এমনকি সেনাবাহিনী মোতায়েনেরও ইঙ্গিত দেন তিনি। তবে আন্দোলনকারীরা এই হুমকিকে প্রত্যাখ্যান করে রাস্তায় থাকার ঘোষণা দিয়েছে। নিউইয়র্কের এক বিক্ষোভকারী বলেন, “আমরা ভয় পাই না। এটাই আমাদের প্রতিবাদের সময়।”

বিভিন্ন স্থানে পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। কিছু এলাকায় কারফিউ জারি করা হলেও তাতে বিক্ষোভ থামেনি। লস অ্যাঞ্জেলেসে এক হাজারের বেশি মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে মিছিল করেছে। যদিও কিছু এলাকায় রাতের বেলায় ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনাও ঘটেছে, যার জেরে শহরটিতে দ্বিতীয় রাতের মতো কারফিউ জারি ছিল। ওয়াশিংটনের স্পোকেন শহরেও মেয়র লিসা ব্রাউন বুধবার রাতে কারফিউ ঘোষণা করেছেন, যা রাত ৯টা ৩০ মিনিট থেকে কার্যকর হয়।

৬৬ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক লিন স্টারজিস, যিনি লস অ্যাঞ্জেলেসে রয়েছেন, বলেন, “আমাদের শহর জ্বলছে না, আগুনে পুড়ছে না—এমনটাই আমাদের ভয় দেখিয়ে বলার চেষ্টা করা হচ্ছে।”

গত বছর নির্বাচনে ট্রাম্প অবৈধ অভিবাসীদের ‘আক্রমণকারী’ হিসেবে চিত্রিত করে জয়লাভ করেছিলেন। এবার সেই অবস্থান থেকেই তিনি সেনা মোতায়েনের নির্দেশ দেন। যদিও ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসোম এতে স্পষ্ট আপত্তি জানিয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক ইতিহাসে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট এইভাবে অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেননি।

বর্তমানে মোতায়েনকৃত ৪ হাজার ৭০০ সেনার মধ্যে ১০০০ জন ইতোমধ্যেই ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (ICE) এজেন্টদের সহায়তায় কাজ করছে। বাকি সেনারা এখনও প্রস্তুতির পর্যায়ে রয়েছে। পেন্টাগন জানিয়েছে, এই পুরো মোতায়েনের খরচ হবে আনুমানিক ১৩৪ মিলিয়ন ডলার।

গভর্নর নিউসোম অভিযোগ করেছেন, ট্রাম্প রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে ইচ্ছাকৃতভাবে এই উত্তেজনা বাড়াচ্ছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, এই ধরনের সামরিকীকরণ কেবল ক্যালিফোর্নিয়াতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না—এটি গণতন্ত্রের ওপর সরাসরি আঘাত।

বৃহস্পতিবার ক্যালিফোর্নিয়ার আইনজীবীরা আদালতে যাবেন, যাতে সেনারা অভিবাসন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে অভিযান চালাতে না পারে। ট্রাম্প প্রশাসনের আইনজীবীরা অবশ্য এই পদক্ষেপকে ‘রাজনৈতিক নাটক’ বলে অভিহিত করেছেন।

ট্রাম্প ন্যাশনাল গার্ডকে অন্যান্য ডেমোক্র্যাট-শাসিত অঙ্গরাজ্যে মোতায়েনের হুমকি দিলেও আন্দোলনকারীরা দমে যাচ্ছেন না। ইতোমধ্যেই সেন্ট লুইস, র‍্যালি, ম্যানহাটান, ইন্ডিয়ানাপলিস, স্পোকেন ও ডেনভার শহরে বিক্ষোভ হয়েছে। টেক্সাসের সান অ্যান্তোনিওতে শত শত মানুষ নগর ভবনের সামনে বিক্ষোভ করেছেন। ওই অঙ্গরাজ্যে রিপাবলিকান গভর্নর গ্রেগ অ্যাবটও ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন করেছেন।

এদিকে শনিবার দেশজুড়ে “নো কিংস” নামে একটি আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়েছে, যেদিন ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনে একটি সামরিক কুচকাওয়াজে অংশ নেবেন। এই কুচকাওয়াজটি একদিকে সেনাবাহিনীর ২৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে হলেও, অনেকে মনে করছেন এটি ট্রাম্পের ৭৯তম জন্মদিনের সাথেও মিলিয়ে আয়োজন করা হয়েছে।

লস অ্যাঞ্জেলেসের মেয়র ক্যারেন ব্যাস বলেছেন, “এই সঙ্কট হঠাৎ করে তৈরি হয়নি, এটি ওয়াশিংটন থেকেই পরিকল্পিতভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে। শহরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক ছিল, কিন্তু শুক্রবার হঠাৎ করে শুরু হওয়া অভিযান থেকেই সমস্যা শুরু হয়েছে।”

এছাড়াও বুধবার বিভিন্ন এলাকায় সশস্ত্র ও মুখোশ পরা ব্যক্তিরা অভিবাসন অভিযান চালিয়েছে। লস অ্যাঞ্জেলেসের উপশহর ডাউনির এক গির্জার ফাদার জানান, সেখানে পাঁচজন সশস্ত্র ব্যক্তি একটি স্প্যানিশভাষী ব্যক্তিকে গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়। তিনি পরিচয় জানতে চাইলে তারা বন্দুক তাক করে বলেন, “পিছিয়ে যান।”

এই বিক্ষোভগুলো মূলত শান্তিপূর্ণ হলেও কিছু বিচ্ছিন্ন সহিংসতার ঘটনাও ঘটছে বলে এএফপি জানিয়েছে। দেশের এই পরিস্থিতি রাজনৈতিক মহলে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।