“প্রকাশ্য রাস্তায় ৪২ বার কুপিয়ে খুন”-বহরমপুরের সেই সুতপা খুনে সুশান্তর হাইকোর্টে মৃত্যুদণ্ড রদ

২০২২ সালের ২ মে মুর্শিদাবাদের বহরমপুরে প্রকাশ্য দিবালোকে ১৯ বছর বয়সী প্রেমিকা সুতপা চৌধুরীকে এলোপাথাড়ি কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত সুশান্ত চৌধুরীকে নিম্ন আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায় রদ করে আমৃত্যু কারাদণ্ডের নির্দেশ দিল কলকাতা হাইকোর্ট। এই রায় বহরমপুরের সেই বিভীষিকাময় ঘটনার স্মৃতি নতুন করে উসকে দিয়েছে, যা এখনো প্রত্যক্ষদর্শীদের মনে গভীর ছাপ ফেলে আছে।
২০২২ সালের সেই সন্ধ্যায় বহরমপুরের গোরাবাজার এলাকা ছিল চিরচেনা ব্যস্ততায় মুখরিত। স্কুল-কলেজ ফেরত ছাত্রছাত্রী, চটপটির দোকানে ভিড়, রিকশার জন্য হাত তোলা মানুষ—হঠাৎই সব স্তব্ধ করে দিয়ে চিৎকারের শব্দ। এরপর একটার পর একটা ছুরির কোপ। পিচঢালা রাস্তায় রক্তাক্ত অবস্থায় লুটিয়ে পড়লেন সুতপা চৌধুরী। তাঁর শরীরে ছুরি চালিয়ে যে দাঁড়িয়ে ছিল, সে আর কেউ নয়, তার ‘প্রেমিক’ পরিচয় দেওয়া সুশান্ত চৌধুরী (২১)। এই নৃশংস খুন এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, প্রত্যক্ষদর্শীরা আজও সেই দৃশ্যের কথা মনে করে রাতে ঘুমাতে পারেন না।
মালদার মেয়ে সুতপা বহরমপুরে মেসে থেকে পড়াশোনা করতেন। তিনি নিজের ভবিষ্যৎ গড়তে চেয়েছিলেন, কারো ক্ষতি করেননি। শুধু ভালোবাসার সম্পর্ক প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। সুশান্ত এই ‘না’ বলার সাহসকেই চিরতরে স্তব্ধ করে দিতে চেয়েছিল। খুনের দিন, মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে একটি বড় খেলনা বন্দুক দিয়ে ভয় দেখিয়ে সে সুতপার ওপর ছুরি চালায়।
২০২৩ সালে বহরমপুরের নিম্ন আদালত এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের জন্য সুশান্তকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেয়। অনেকেই এই রায়কে ‘ন্যায্য’ বলে মনে করেছিলেন। তবে, ঠিক এক বছর পর, ২০২৪ সালের ১২ জুন, কলকাতা হাইকোর্ট নিম্ন আদালতের রায় পরিবর্তন করে ফাঁসির পরিবর্তে আমৃত্যু কারাদণ্ডের নির্দেশ দেয়। উচ্চ আদালত একই সঙ্গে স্পষ্ট করে জানায় যে, সুশান্ত ৪০ বছর পর্যন্ত মুক্তির জন্য কোনো আবেদন করতে পারবে না। অর্থাৎ, যতদিন তার দেহে প্রাণ থাকবে, ততদিন তাকে কারাগারের চার দেওয়ালের মধ্যেই কাটাতে হবে।
অনেকে মনে করছেন, হাইকোর্ট হয়তো সুশান্তের বয়স (২১ বছর বয়সে খুন করেছিল, এখন ২৪) বিবেচনা করে কিছুটা মানবিক হওয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু সুতপার পরিবার বা বন্ধুদের কাছে বয়স কোনো যুক্তি হতে পারে না। খুনের ধরন, হত্যাকারীর মনোভাব—সবকিছুই ছিল ঠান্ডা মাথার পরিকল্পনার ফল। এমন নৃশংস ঘটনা হঠাৎ করে ঘটে না। চুপচাপ পরিকল্পনা করে, ভয় দেখানোর জন্য বন্দুক হাতে নিয়ে, পথ আটকে, ছুরি চালিয়ে খুন করা যায় না যদি মনের ভিতর থেকে ‘ও আমার না হলে কাউকে হতে দেব না’—এই ভয়ঙ্কর মানসিকতা না আসে। আদালত ৪০ বছর পর্যন্ত সুশান্তকে কোনো আবেদন করার সুযোগ না দিয়ে একটি কঠোর বার্তা দিয়েছে: যদি কেউ নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাউকে বাঁচতে না দেয়, তবে তার নিজের বাঁচার অধিকারও সীমিত করে দেওয়া হবে।
এই রায় নিয়ে জনমনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কেউ কেউ মনে করছেন, এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ডের জন্য মৃত্যুদণ্ডই একমাত্র ন্যায্য সাজা। আবার কেউ কেউ আদালতের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন, যেখানে শাস্তি কমিয়ে দেওয়া হয়নি, বরং দীর্ঘমেয়াদী কারাবাসের মাধ্যমে অপরাধীকে সমাজের বাইরে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে।