ট্রাম্প-মাস্ক বিরোধে ‘সর্বকালের সবচেয়ে বড় সংকট’ নাসায়, উদ্বিগ্ন বিজ্ঞানী ও গবেষকরা

“শিল-পাটার ঘষায় প্রাণ যায় মরিচের।” বাংলায় প্রচলিত এই পুরোনো প্রবাদটি যেন বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার পরিস্থিতিকেই তুলে ধরছে। শিল-পাটা হয়ে উঠেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এবং প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্কের লাগাতার বাগযুদ্ধ, আর এর মাঝে পড়ে সংকটে পড়েছে নাসা। তাঁদের ব্যক্তিগত আক্রমণ এবং রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে জল্পনা-কল্পনার মধ্যেই অনিশ্চয়তার কালো মেঘ ঘনিয়ে আসছে নাসার বাজেটে, যা বিশ্বজুড়ে মহাকাশ গবেষণার ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করতে পারে।
ট্রাম্প-মাস্ক দ্বন্দ্বের জেরে নাসার অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এবং টেসলা ও স্পেসএক্স-এর কর্ণধার ইলন মাস্কের মধ্যে চলমান বাগযুদ্ধ এখন চরমে। একে অপরের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত আক্রমণের পাশাপাশি মাস্কের রাজনীতিতে আসার জল্পনাও এই দ্বন্দ্বকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। পাল্টা ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, মাস্কের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক শেষ হয়ে গেছে এবং যদি তিনি মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বিরুদ্ধে ডেমোক্র্যাটদের তহবিল দেন, তবে তার পরিণতি গুরুতর হবে।
এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই নাসার বাজেট নিয়ে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা। বিবিসি-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই বিরোধের জেরে নাসার বাজেটে বড় ধরনের কাটছাঁট হতে পারে। নাসা তাদের বাজেটের যে খসড়া মার্কিন কংগ্রেসে জমা দিয়েছে, তাতে বিজ্ঞান গবেষণার জন্য বিভিন্ন প্রকল্পের বাজেট প্রায় অর্ধেকে কমিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর ফলে প্রস্তুতিতে থাকা বা ইতিমধ্যেই মহাকাশে পাঠানো মোট ৪০টি মহাকাশ মিশন বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
স্পেসএক্স-এর উপর নির্ভরশীল নাসা, ট্রাম্পের হুমকির কারণ
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন, মাস্কের কোম্পানি স্পেসএক্স-এর সঙ্গে করা বিভিন্ন সরকারি চুক্তি বাতিল করে দেবেন। অথচ, আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে মানুষ ও মালপত্র পাঠাতে নাসার একমাত্র ভরসা স্পেসএক্স-এর ফ্যালকন ৯ রকেট। নাসা জানিয়েছে, ভবিষ্যতে চাঁদ ও মঙ্গলে নভোচারী পাঠানোর পরিকল্পনাতেও তারা স্পেসএক্সের রকেটের ওপরই নির্ভর করছে।
‘ওপেন ইউনিভার্সিটি’র মহাকাশবিজ্ঞানী ড. সিমিয়ন বারবার এই পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, নাসার বাজেট ও ভবিষ্যৎ নিয়ে যেসব অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তা নভোচারী পাঠানোর মতো বিভিন্ন মহাকাশ মিশন কর্মসূচির ওপর “ভীতিকর প্রভাব” ফেলছে। এতে এই কার্যক্রম ধীর বা স্থগিত হয়ে যেতে পারে। “গত এক সপ্তাহে ট্রাম্প-মাস্কের মধ্যে আমরা যেসব অবাক করা কথাবার্তা, হঠাৎ নেওয়া সিদ্ধান্ত ও আগের সিদ্ধান্ত থেকে ফিরে আসা দেখেছি, সেগুলো আমাদের স্বপ্ন ও লক্ষ্য গড়ার মূল ভিত্তিকেই নষ্ট করছে,” মন্তব্য করেন ড. বারবার।
বাজেট কাটছাঁটের বিতর্ক: লক্ষ্য কি কেবল মঙ্গল?
বিবিসি-র প্রতিবেদন অনুসারে, প্রেসিডেন্ট ও মাস্কের মধ্যে দ্বন্দ্ব ছাড়াও, নাসার বাজেট থেকে বড় ধরনের অর্থ কমানোর জন্য হোয়াইট হাউসের অনুরোধ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। হোয়াইট হাউস বিজ্ঞান, গবেষণা ও অন্যান্য সব খাতে অর্থ কমানোর লক্ষ্যে পরিকল্পনা করলেও, কেবল মঙ্গলে নভোচারী পাঠানোর পরিকল্পনার জন্য আলাদা করে ১০ কোটি ডলার বরাদ্দ বাড়িয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্যাসাডিনায় অবস্থিত ‘প্ল্যানেটারি সোসাইটি’র মহাকাশ নীতির প্রধান ক্যাসি ড্রেইয়ার নাসার বাজেটে এই কাটছাঁটকে “যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ কর্মসূচির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সংকট” বলে অভিহিত করেছেন। তবে, নাসা বলেছে, তাদের বাজেট কমানোর পরিকল্পনাকে এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যাতে চাঁদ ও মঙ্গল গ্রহ গবেষণায় দরকারি বিভিন্ন কাজই বরাদ্দ পায় – অর্থাৎ, বাজেট কমলেও গুরুত্বপূর্ণ মিশনগুলো যেন থেমে না যায়।
SLS বনাম স্টারশিপ: নাসা কি ভুল পথে?
‘ক্র্যানফিল্ড ইউনিভার্সিটি’র মহাকাশ বিশ্লেষক ড. অ্যাডাম বেকার বলেছেন, বাজেট কমানোর এসব পরিকল্পনা যদি কংগ্রেস অনুমোদন করে, তবে এটা নাসার মূল লক্ষ্য ও কাজের ধরণ পুরোপুরি বদলে দেবে। তাঁর মতে, “নাসাকে দুটি কাজের লক্ষ্যে নতুন করে সাজাচ্ছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। একটি হচ্ছে, চীনের আগে চাঁদে নভোচারী পাঠানো ও মঙ্গলে মার্কিন পতাকা বসানো। এ দুটি কাজই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে ধারণা তাঁর। আর বাকি যে কোনও কাজ এর থেকে কম জরুরি ট্রাম্পের কাছে।”
তবে, সমালোচকরা বলছেন, নাসা এখন বড় সংস্থা হিসেবে অনেক অগোছালো হয়ে গিয়েছে, যেখানে নিয়মিত অতিরিক্ত খরচের পাশাপাশি করদাতাদের অর্থও অপচয় করছে তারা। নাসার অন্যতম বড় সমস্যাগুলোর একটি হচ্ছে তাদের নতুন রকেট ‘স্পেস লঞ্চ সিস্টেম’ বা এসএলএস, যা আমেরিকান নভোচারীদের আবারও চাঁদে পাঠানোর পরিকল্পনার লক্ষ্যে তৈরি হচ্ছে। এই রকেট উন্নয়নে অনেক সময় লেগেছে ও খরচও বেড়েছে, ফলে প্রতিটি উৎক্ষেপণে খরচ হচ্ছে চারশ ১০ কোটি ডলার। এর বিপরীতে, মাস্কের স্পেসএক্স কোম্পানির স্টারশিপ রকেট প্রতি উৎক্ষেপণে কেবল খরচ হয় ১০ কোটি ডলার, কারণ এটি বারবার ব্যবহার করা যায়। জেফ বেজোসের ব্লু অরিজিন কোম্পানিও তাদের নিউ গ্লেন রকেটের জন্য একই ধরনের খরচ কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
হোয়াইট হাউসের প্রস্তাব অনুসারে ধীরে ধীরে এসএলএস রকেটের ব্যবহার বন্ধ হবে এবং এদের জায়গা নেবে স্টারশিপ ও নিউ গ্লেন রকেট। তবে, স্টারশিপের শেষ তিনটি পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ সফল হয়নি এবং ব্লু অরিজিনও সম্প্রতি তাদের রকেট চাঁদে পাঠানো নিয়ে পরীক্ষার কাজ শুরু করেছে।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় প্রভাব ও ভবিষ্যতের উদ্বেগ
ড. বারবার উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, “চিন্তার বিষয় হচ্ছে, নাসা হয়তো এক সমস্যার হাত থেকে বেরিয়ে এসে আরও বড় সমস্যার মধ্যে পড়তে পারে।” তিনি আরও বলেন, “এসএলএস-এর বিকল্প হিসেবে যেসব রকেট তৈরি হচ্ছে, তাদের উন্নয়নের খরচ দিচ্ছেন ইলন মাস্ক ও জেফ বেজোস। তারা যদি এই কাজ চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা হারিয়ে ফেলেন এবং স্পেসএক্স বা ব্লু অরিজিন নিজেদের রকেট উন্নয়নের জন্য আরও বেশি অর্থ চায়, তাহলে মার্কিন কংগ্রেসকে তাদের সেই অর্থ দিতে হবে।”
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, বাজেট কাটার কারণে বাতিল হতে পারে এমন অনেক মিশনে গুরুত্বপূর্ণ বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা রয়েছে, যেমন – জলবায়ু পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ বা অন্য গ্রহে গবেষণা। এসব মিশনে অনেক দেশের সঙ্গে মিলে কাজ করা হচ্ছে, তাই এর প্রভাব আন্তর্জাতিক পর্যায়েও পড়বে।
“যা তৈরি করতে অনেক সময়, পরিশ্রম ও সম্পদ লেগেছে তা হঠাৎ করে নষ্ট করে দেওয়া হচ্ছে, অথচ পরে সেটা আবার কীভাবে গড়া হবে – সেই পরিকল্পনাটুকুও নেই। এটা ভীষণ দুঃখজনক ও চিন্তার বিষয়,” বলেন ড. বারবার।
বাজেট কাটছাঁটের ফলে যেসব প্রকল্প বাতিলের ঝুঁকিতে রয়েছে, তার মধ্যে অনেকগুলো গ্রহ অনুসন্ধান মিশন এরইমধ্যে মহাকাশে পাঠানো হয়েছে। এদের উন্নয়ন ও উৎক্ষেপণের খরচ আগেই দেওয়া হয়েছে; এখন কেবল সেগুলো চালানোর খরচ কিছুটা কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে, যা খুব বেশি সাশ্রয়ীও হবে না। এছাড়াও হুমকির মুখে রয়েছে ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা বা ইএসএ-এর সঙ্গে নাসার দুটি গুরুত্বপূর্ণ যৌথ মিশনও। যার একটি হচ্ছে, মঙ্গল গ্রহ থেকে নাসার পার্সিভ্যারেন্স রোভার যে পাথরের নমুনা সংগ্রহ করেছে, সেগুলো পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনা। আরেকটি হচ্ছে, ইউরোপের রোজালিন্ড ফ্র্যাঙ্কলিন রোভারকে মঙ্গল গ্রহে পাঠিয়ে সেখানে অতীতে কোনো প্রাণের চিহ্ন ছিল কি না, তা খুঁজে বের করার মিশন। এই সমস্ত মিশন এখন ট্রাম্প-মাস্কের এই ‘শিল-পাটার ঘষায়’ অনিশ্চিত ভবিষ্যতের সম্মুখীন।