বিশেষ: চিনাব সেতু নির্মাণের নেপথ্যে ১৭ বছরের পরিশ্রম রয়েছে যার, জেনেনিন কে এই মহিলা?

শুক্রবার, ৬ জুন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী যে দিন বিশ্বের সর্বোচ্চ আর্চ রেলব্রিজ—ঐতিহাসিক চিনাব রেলওয়ে ব্রিজের উদ্বোধন করলেন, সেদিন ভারতীয় প্রকৌশলের মুকুটে যুক্ত হলো এক নতুন পালক। জম্মুকে শ্রীনগরের সঙ্গে যুক্ত করা এই সুবিশাল সেতুটি কেবল একটি প্রকৌশলগত বিস্ময়ই নয়, এটি এক ভারতীয় নারী, অধ্যাপক মাধবী লতার অদম্য মেধা ও ১৭ বছরের কঠোর পরিশ্রমের প্রতীক।
চিনাব নদীর তলদেশ থেকে ৩৫৯ মিটার উঁচু এবং ১,৩১৫ মিটার দীর্ঘ এই সেতুটি প্যারিসের আইফেল টাওয়ারের চেয়েও ৩৫ মিটার বেশি উঁচু! ১২০ বছরের আয়ুষ্কাল ধারণ করে নির্মিত এই সেতু ঘণ্টায় ২৬০ কিলোমিটার গতির ঝড় এবং প্রবল ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ সহ্য করতে সক্ষম। ১,৪৮৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই বিশাল প্রকল্পটি ভারতের প্রকৌশল সক্ষমতার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
বিস্ময়কর স্থপতি: অধ্যাপক মাধবী লতা
এই ঐতিহাসিক সেতু নির্মাণের নেপথ্যে রয়েছেন বেঙ্গালুরুর ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স (IISc)-এর প্রতিভাবান অধ্যাপিকা মাধবী লতা। চিনাব সেতুর নকশা থেকে শুরু করে নির্মাণ প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
১৯৯২ সালে জওহরলাল নেহরু টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটি থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বি.টেক সম্পন্ন করার পর, এনআইটি ওয়ারাঙ্গাল থেকে এম.টেক-এ স্বর্ণপদক লাভ করেন। ২০০০ সালে আইআইটি মাদ্রাজ থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। বর্তমানে তিনি IISc-তে সিনিয়র প্রফেসর হিসেবে কর্মরত এবং ভূতাত্ত্বিক গবেষণায় তার অসংখ্য অবদান রয়েছে।
অজস্র স্বীকৃতি ও নিরন্তর পরিশ্রম:
অধ্যাপক মাধবী লতার মেধা ও পরিশ্রমের স্বীকৃতি হিসেবে তার ঝুলিতে রয়েছে অজস্র পুরস্কার। ২০২১ সালে তিনি ‘বেস্ট ওম্যান জিওটেকনিকাল রিসার্চার’ পুরস্কারে সম্মানিত হন। ২০২২ সালে তার নাম উঠে আসে STEAM অফ ইন্ডিয়া-র সেরা ৭৫ জন মহিলার তালিকায়। এছাড়াও তিনি IISc-এর এসকে চট্টোপাধ্যায় এক্সেলেন্ট রিসার্চার অ্যাওয়ার্ড, SERB POWER ফেলোশিপ এবং কর্নাটক বুক অব রেকর্ডস-এর উইমেন অ্যাচিভার্স অ্যাওয়ার্ডের মতো prestigious সম্মাননা অর্জন করেছেন।
২০২৫ সালের ২৮ মে, ইন্ডিয়ান জিওটেকনিকাল জার্নাল-এর একটি বিশেষ সংখ্যায় অধ্যাপক লতার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। ‘Design As You Go: The Case Study of Chenab Railway Bridge’ শীর্ষক এই প্রবন্ধে তিনি চিনাব সেতু নির্মাণের ১৭ বছরের অভিজ্ঞতা ও নানা চ্যালেঞ্জ নিয়ে বিশদে আলোচনা করেছেন, যা প্রকৌশল জগতে তার গভীর জ্ঞান এবং ব্যবহারিক দক্ষতার প্রমাণ।
গর্বিত দেশ, গর্বিত প্রতিষ্ঠান:
চিনাব ব্রিজ উদ্বোধনের পর IISc তাদের সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেলে লেখে, “মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যে চিনাব ব্রিজ উদ্বোধন করেছেন, তার নেপথ্যে অধ্যাপক মাধবী লতা ও তাঁর দলের বড় ভূমিকা রয়েছে। আমরা গর্বিত।” অর্থনীতিবিদ ও লেখক সঞ্জীব সান্যালও তার এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্টে লিখেছেন, “মাধবী লতা চিনাব ব্রিজ নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত সেরা ইঞ্জিনিয়ারদের মধ্যে অন্যতম। ১৭ বছর আগে এই প্রোজেক্ট নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন।”
এই সুবিশাল সেতু তৈরিতে আইফেল টাওয়ারের থেকেও চারগুণ বেশি স্টিল ব্যবহার করা হয়েছে। পাহাড়ি ও ভূমিকম্প প্রবণ দুর্গম অঞ্চলে এমন একটি প্রকল্পের বাস্তবায়নে অধ্যাপক মাধবী লতা এবং তার টিমের প্রতিটি সদস্যের অবদান স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। চিনাব ব্রিজ কেবল একটি অবকাঠামোগত মাইলফলক নয়, এটি ভারতীয় মেধা ও নারীর অসামান্য সক্ষমতার এক জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত।