AI-নিয়ে দুশ্চিন্তা গুগলের প্রধানের, তবে চাকরি হারানো নিয়ে নয়, জেনেনিন তাহলে কী ?

যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির প্রভাবে চাকরির বাজারে বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কায় বিশ্বজুড়ে নানা সতর্কবার্তা উচ্চারিত হচ্ছে, তখন গুগলের গবেষণা প্রতিষ্ঠান ডিপমাইন্ডের প্রধান ডেমিস হাসাবিস এক ভিন্ন এবং আরও গভীর আশঙ্কার কথা জানালেন। তাঁর মতে, এআই যদি ভুল হাতে পড়ে, তাহলে তা মানবজাতির জন্য এক মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

লন্ডনে চলমান এসএক্সএসডব্লিউ (SXSW) উৎসবে এক সাক্ষাৎকারে এই নোবেল বিজয়ী গবেষক বলেন, “চাকরি নিয়ে নয়, আমি বেশি চিন্তিত এই প্রযুক্তি যদি ভুল মানুষের হাতে পড়ে।” হাসাবিস আরও যোগ করেন, “একজন দুর্বৃত্ত এআই প্রযুক্তিকে ক্ষতিকর কাজে ব্যবহার করতে পারে। তাই মূল প্রশ্ন হলো, কীভাবে আমরা এই প্রযুক্তি ভালো উদ্দেশ্যে ব্যবহারের পথ খুলে দেব এবং খারাপ ব্যবহারের পথ বন্ধ করব।”

এজিআই-এর অপব্যবহার: মূল উদ্বেগ
সম্প্রতি এআইকেন্দ্রিক স্টার্টআপ ‘অ্যানথ্রপিক’-এর প্রধান ডারিও অ্যামোডেই মন্তব্য করেছিলেন যে, এআই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে অর্ধেকেরও বেশি ‘এন্ট্রি-লেভেল’ ‘হোয়াইট-কলার’ চাকরি বিলুপ্ত করতে পারে। (উল্লেখ্য, ‘হোয়াইট-কলার জব’ বলতে কায়িক শ্রমের পরিবর্তে মস্তিষ্কভিত্তিক কাজ বোঝায়, যেমন অফিসের কাজ; এর বিপরীতে ‘ব্লু-কলার জব’ হলো কায়িক শ্রমনির্ভর কাজ)। তবে হাসাবিস এই ধারণার চেয়েও বেশি শঙ্কিত ‘আর্টিফিশিয়াল জেনারেল ইন্টেলিজেন্স (এজিআই)’-এর সম্ভাব্য অপব্যবহার নিয়ে। এজিআই হলো এমন একটি কাল্পনিক স্তরের এআই, যা মানুষের মতো বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন।

এআই-এর অপব্যবহারের উদ্বেগজনক উদাহরণ
এআই-এর অপব্যবহারের কিছু উদ্বেগজনক দৃষ্টান্ত ইতিমধ্যেই দেখা গেছে। সম্প্রতি মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই (FBI) জানিয়েছে যে, কিছু হ্যাকার কণ্ঠস্বর নকল করতে এআই ব্যবহার করেছে সরকারি কর্মকর্তার মতো কথা বলার জন্য। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক রিপোর্টেও বলা হয়, এআই জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ‘বিপর্যয়কর’ হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

এছাড়াও, ডিপফেইক পর্নোগ্রাফি তৈরিতে এআইয়ের অপব্যবহার ব্যাপক হারে বেড়েছে। এর বিরুদ্ধে ‘টেইক ইট ডাউন অ্যাক্ট’ (Take It Down Act) নামের এক বিলে স্বাক্ষর করে আইনে রূপান্তর করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। এই আইনে অনুমতি ছাড়া যৌন নিপীড়নমূলক ছবি বা ভিডিও শেয়ার করলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে গণ্য হবে।

ভবিষ্যতের সম্ভাবনা ও সতর্কতা
এআই-কে ঘিরে এই উদ্বেগের মধ্যেও হাসাবিস ভবিষ্যতের সম্ভাবনায় আশাবাদী। তিনি জানান, গুগল এমন এক ‘ইউনিভার্সাল এআই অ্যাসিস্ট্যান্ট’ তৈরি করছে, যা ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে দৈনন্দিন কাজ করবে, বই-ছবি-বন্ধুর পরামর্শ দেবে, এমনকি চোখে পরার স্মার্ট চশমাতেও সংযুক্ত থাকবে। তিনি মনে করেন, “মানুষের দৈনন্দিন জীবনে এআই এজেন্ট এক অভ্যস্ত জীবনের অংশ হয়ে যাবে।”

ডিপমাইন্ড প্রধান মনে করেন, এই প্রযুক্তির ব্যবহারে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও সমঝোতা জরুরি, যদিও বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় তা কঠিন। হাসাবিস বলেন, “ভবিষ্যতে পরিস্থিতি উন্নত হলে এটা আরও পরিষ্কার হয়ে যাবে যে, বৈশ্বিকভাবে নীতিমালা প্রয়োজন।”

তবে এআই প্রযুক্তি এখনও পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য নয়। এটি বিভ্রান্তিকর তথ্য (‘হ্যালুসিনেশন’), পক্ষপাত, ও ভুল সিদ্ধান্ত দিতে পারে। গত মাসেই যুক্তরাষ্ট্রের দুটি সংবাদপত্র, শিকাগো সান টাইমস ও ফিলাডেলফিয়া ইনকোয়ারার, এআইয়ের বানানো একটি বইয়ের তালিকা প্রকাশ করেছে, যেখানে গ্রীষ্মকালে পড়ার মতো বইয়ের নাম থাকার কথা। কিন্তু ওই তালিকায় এআই এমন বইয়ের নাম ঢুকিয়ে দিয়েছে যার কোনো অস্তিত্বই নেই।

হাসাবিস বিশ্বাস করেন, এআই যেমন মানুষের উৎপাদনক্ষমতা বাড়াতে পারে, তেমনি নতুন ধরনের চাকরিও তৈরি করতে পারে। তবে, সমাজকে এই প্রযুক্তিগত রূপান্তরের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হবে এবং এই অতিরিক্ত উৎপাদনের সুফল সবার মধ্যে ভাগ করে নিতে হবে। তিনি উপসংহারে বলেন, “ইন্টারনেট আসার সময় যেমন বদল এসেছে, এবারও আসবে। অনেক পুরনো চাকরি যাবে, কিন্তু তার জায়গায় আরও ভালো চাকরি আসবে কি না, সেটাই দেখার বিষয়।”