বিশেষ: বেঙ্গালুরুতে পদপিষ্টে মৃত ১১ জন, ভারতে আর কোথায় কোথায় ঘটেছে এমন ঘটনা?

রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু (RCB) প্রথমবারের মতো আইপিএল ট্রফি জিতেছে, আর এই ঐতিহাসিক জয় উদযাপনে বুধবার বেঙ্গালুরুতে আয়োজন করা হয়েছিল এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের। কিন্তু সেই আনন্দ মুহূর্তেই পরিণত হলো গভীর শোকে। বিশৃঙ্খলার কারণে পদপিষ্ট হয়ে প্রাণ হারালেন ১১ জন, আহত হলেন আরও ৩৩ জন।

এই মর্মান্তিক ঘটনায় শোকপ্রকাশ করেছেন কর্নাটকের মুখ্যমন্ত্রী সিদ্দারামাইয়া। তিনি নিজেও স্বীকার করেছেন, এমন পদপিষ্ট হওয়ার ঘটনা ভারতে নতুন নয়, আগেও বহুবার এমন ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটেছে। প্রশ্ন হলো, আমরা কি সত্যিই এই ঘটনাগুলো থেকে কোনো শিক্ষা নিইনি?

ভারতের ইতিহাসে পদপিষ্টের এক দীর্ঘ এবং মর্মান্তিক তালিকা:
বেঙ্গালুরুর এই ঘটনা ভারতের ইতিহাসে ঘটে যাওয়া অসংখ্য পদপিষ্টের ঘটনারই আরেকটি পুনরাবৃত্তি। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে, বিভিন্ন কারণে, বারবার জনসমাগম নিয়ন্ত্রণ করতে না পারার খেসারত দিতে হয়েছে সাধারণ মানুষকে। আসুন, সাম্প্রতিক এবং উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটনার দিকে ফিরে তাকানো যাক:

১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫: নয়াদিল্লি রেলওয়ে স্টেশন
রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত এই স্টেশনে পদপিষ্ট হয়ে কমপক্ষে ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল এবং আরও ১৫ জন আহত হন।

২৯ জানুয়ারি, ২০২৫: উত্তরপ্রদেশের মহাকুম্ভ মেলা
বিশ্বের বৃহত্তম এই ধর্মীয় সমাবেশে লক্ষ লক্ষ মানুষের ভিড়ে পদপিষ্ট হয়ে অনেক মানুষের মৃত্যু হয়েছিল, যদিও সঠিক সংখ্যা জানা যায়নি।

৮ জানুয়ারি, ২০২৫: অন্ধ্রপ্রদেশের একটি মন্দির
বিনামূল্যে দর্শনের অনুমতি পেয়ে হাজার হাজার ভক্ত ভিড় জমিয়েছিলেন। সেই ভিড়ে পদপিষ্ট হয়ে মন্দিরের কাছে কমপক্ষে ৬ জন মারা যান এবং ৩৫ জন আহত হন।

জুলাই ২০২৪: উত্তরপ্রদেশের হাথরাস
একজন হিন্দু ধর্মপ্রচারকের সভায় হাজার হাজার ভক্তের সমাগম ঘটেছিল। গুরুকে কাছ থেকে দেখার জন্য ভক্তদের মধ্যে ছোটাছুটি শুরু হলে পদপিষ্ট হয়ে অন্তত ১২১ জন প্রাণ হারান।

জানুয়ারি, ২০২২: জম্মু ও কাশ্মীরের বৈষ্ণোদেবী মন্দির
নববর্ষের সময় বিশাল ভিড়ে মন্দিরে প্রবেশের মুখে পদপিষ্ট হয়ে কমপক্ষে ১২ জনের মৃত্যু হয় এবং অনেকে আহত হন।

অক্টোবর, ২০১৩: মধ্যপ্রদেশের রতনগড় মন্দির
নবরাত্রি উদযাপনের জন্য এক লক্ষ ৫০ হাজারেরও বেশি লোক জড়ো হওয়ায় পদপিষ্টের ঘটনা ঘটে। এই ঘটনায় প্রায় ১১৫ জনের মৃত্যু হয় এবং শতাধিক আহত হন।

ফেব্রুয়ারি, ২০১৩: উত্তরপ্রদেশের কুম্ভমেলা
২০১৩ সালের কুম্ভমেলায় পদপিষ্টের ঘটনায় কমপক্ষে ৩৬ জন তীর্থযাত্রী প্রাণ হারান। মৃতদের মধ্যে ২৭ জন মহিলা ছিলেন, যাঁদের মধ্যে ৮ বছর বয়সি একটি ছোট মেয়েও ছিল।

মার্চ, ২০১০: উত্তরপ্রদেশের একটি হিন্দু মন্দির
বিনামূল্যে খাবার এবং পোশাক সংগ্রহের জন্য বিশাল ভিড় জমেছিল। সেই পদপিষ্টের ঘটনায় কমপক্ষে ৬৩ জন মারা যান, যাঁদের মধ্যে অনেক শিশুও ছিল।

সেপ্টেম্বর, ২০০৮: রাজস্থানের চামুণ্ডা দেবী মন্দির
নবরাত্রি উদযাপনের জন্য প্রচুর তীর্থযাত্রীর সমাবেশ হয়েছিল। সেই সময়েও পদপিষ্ট হয়ে প্রায় ২৫০ জন প্রাণ হারান।

আগস্ট, ২০০৮: হিমাচল প্রদেশের নয়না দেবী মন্দির
পাহাড়ের চূড়ার এই মন্দিরে ভূমিধস হয়েছে বলে একটি গুজব রটেছিল। সেই ঘটনায় পদপিষ্ট হয়ে কমপক্ষে ১৪৫ জন তীর্থযাত্রীর মৃত্যু হয়।

জানুয়ারি, ২০০৫: মহারাষ্ট্রের মান্ধারদেবী মন্দির
ওয়াই শহরের মান্ধারদেবী মন্দিরে পদপিষ্টের ঘটনায় ২৬৫ জনেরও বেশি ভক্তের মৃত্যু হয় এবং শতাধিক মানুষ আহত হয়েছিলেন। জানা যায়, মন্দিরে যাওয়ার সিঁড়ি পিচ্ছিল হওয়ায় এই ঘটনা ঘটেছিল।

চিন্নাস্বামী স্টেডিয়ামের মর্মান্তিক চিত্র: প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান
বেঙ্গালুরুর চিন্নাস্বামী স্টেডিয়ামের সামনে কী ঘটেছিল, তা জানিয়েছেন এক প্রত্যক্ষদর্শী, লিঙ্গরাজাপুরম এলাকার বাসিন্দা। তিনি বলেন, “দেখলাম তিনটে মেয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ল… বন্যার সময় জলের স্রোত যেমন হুহু করে ঢোকে, ঠিক তেমনই স্টেডিয়ামের ৩ নম্বর গেট দিয়ে লোক ঢুকতে গেল। অনেকেই হুমড়ি খেয়ে মাটিতে পড়ে গেল। আর, তাদের মাড়িয়ে লোক স্টেডিয়ামের ভিতরে ঢুকতে শুরু করল। কোনো পুলিশ ছিল না ভিড় নিয়ন্ত্রণ করার।”

প্রশ্ন একটাই: আর কত প্রাণ গেলে আমরা শিখব?
এই প্রতিটি ঘটনাই অত্যন্ত দুঃখজনক এবং মর্মান্তিক। বারবার একই ধরনের দুর্ঘটনা ঘটা প্রমাণ করে যে, জনসমাগম ব্যবস্থাপনায় আমাদের এখনও অনেক গলদ রয়ে গেছে। সঠিক পরিকল্পনা, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং ভিড় নিয়ন্ত্রণের আধুনিক কৌশল প্রয়োগ না করলে, আনন্দের মুহূর্তগুলো আবারও শোকের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। বেঙ্গালুরুর এই ১১টি প্রাণ আমাদের কাছে এক কঠিন প্রশ্ন রেখে গেল: আর কত প্রাণ গেলে আমরা এই বিপর্যয় থেকে সত্যিকারের শিক্ষা নেব?