কেন IPL-সেলিব্রেশন বদলে গেল মৃত্যুফাঁদে? বিভীষিকার কী কী কারণ জানালো বেঙ্গালুরু প্রশাসন

মহাকুম্ভ বা দিল্লি স্টেশনের পদপিষ্ট হয়ে মৃত্যুমিছিলের মতো মর্মান্তিক ঘটনা থেকেও কি আমরা শিক্ষা নিইনি? ‘প্রিভেনশন ইজ বেটার দ্যান কিওর’ – এই প্রবাদবাক্যটি আবারও মিথ্যে প্রমাণ হলো। বেঙ্গালুরুতে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (IPL) জয়ের সেলিব্রেশন ঘিরে বুধবার রাতের মর্মান্তিক ঘটনাটি সেই প্রশ্নই তুলে দিল। চিন্নাস্বামী স্টেডিয়ামের বাইরে পদপিষ্ট হয়ে ১১টি তরতাজা প্রাণের মৃত্যু এবং ৪৭ জনের গুরুতর জখম হওয়ার ঘটনা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ শুরু হয়েছে বুধবার রাত থেকেই। বেঙ্গালুরু পুলিশও দুর্ঘটনার তিনটি প্রাথমিক কারণ চিহ্নিত করেছে।
দুর্ঘটনার কারণ: অব্যবস্থাপনার ত্রয়ী
বেঙ্গালুরু পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে দুর্ঘটনার তিনটি মূল কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে:
১. সঠিক পরিকল্পনার অভাব: এত বিশাল সংখ্যক জনসমাগমের জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছিল না।
২. জনসংখ্যার ভুল অনুমান: কত লোক জড়ো হতে পারে, সে সম্পর্কে প্রশাসনের কোনো সঠিক অনুমান ছিল না।
৩. ফ্রি পাসের বিভ্রান্তি: স্টেডিয়ামের মধ্যে সেলিব্রেশনে যোগ দেওয়ার জন্য কত ফ্রি পাস বিলি হবে, তা নিয়ে আগাগোড়া বিভ্রান্তি ছিল।
উন্মাদনা থেকে বিপর্যয়: ঘটনার পর্যায়ক্রম
রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু (RCB)-এর আইপিএল ট্রফি জয়ের সেলিব্রেশন মঙ্গলবার রাত থেকেই শুরু হয়ে গিয়েছিল। বেঙ্গালুরুর ছোট-বড় প্রায় সব রাস্তায় হাজার হাজার মানুষ নেমে পড়েছিলেন। এমজি রোড, চার্চ স্ট্রিট এবং সেন্ট্রাল বিজনেস ডিস্ট্রিক্টের কয়েকটি এলাকায় লোকসমাগম সবচেয়ে বেশি হয়েছিল।
বুধবার সকালে RCB টিম ম্যানেজমেন্ট ঘোষণা করে বসে, বিধান সৌধ থেকে স্টেডিয়াম পর্যন্ত এক কিলোমিটার রাস্তায় খোলা বাসে ‘ভিকট্রি প্যারেড’ হবে। এরপর স্টেডিয়ামে সেলিব্রেশন অনুষ্ঠিত হবে এবং এর জন্য অনলাইনে কিছু ফ্রি পাস বিলি করা হবে। কিন্তু কত ফ্রি পাস বিলি হবে, সে সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট ঘোষণা ছিল না।
দুপুরের দিকে পরিস্থিতি জটিল হতে শুরু করে। বুধবার বেলা ১১টা ৫৬ মিনিটে বেঙ্গালুরু ট্রাফিক পুলিশ হঠাৎ ঘোষণা করে দেয় যে, ভিকট্রি প্যারেড বাতিল করা হয়েছে। বেলা দেড়টা নাগাদ RCB টিম HAL এয়ারপোর্টে নামে এবং সেখান থেকে বাসে হোটেলে চলে যায়। হোটেল থেকে তাদের বিধান সৌধে যাওয়ার কথা ছিল, যেখানে কর্নাটকের মুখ্যমন্ত্রী সিদ্দারামাইয়ার RCB টিমকে সংবর্ধনা দেওয়ার কথা ছিল। ততক্ষণে বিধান সৌধে কাতারে কাতারে মানুষ জড়ো হয়েছিলেন সংবর্ধনা দেখার জন্য। অনেকেই রাস্তার ধারের গাছের ডালে চড়েছিলেন, বহু মানুষ কর্নাটক হাইকোর্ট বিল্ডিংয়ের ছাদে উঠে পড়েছিলেন।
এই সব যখন চলছিল, একই সঙ্গে মানুষের ভিড় সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো স্টেডিয়ামের দিকে এগিয়ে চলছিল। ঠিক এই সময় আচমকা নাম্মা মেট্রো কর্তৃপক্ষ ঘোষণা করে দেন, প্রবল ভিড়ের কারণে কাবন পার্ক এবং বি আর আম্বেদকর স্টেশনে মেট্রো রেল থামবে না।
বিভ্রান্তি ও অব্যবস্থাপনার পরিণতি
দুর্ঘটনার তদন্তকারী সরকারি অফিসারদের একাংশ জানাচ্ছে, বিধান সৌধের ভিড়ে থাকা অধিকাংশ মানুষ ভেবেছিলেন, সংবর্ধনার শেষে খোলা বাসে চাপিয়ে ক্রিকেটারদের স্টেডিয়ামে নিয়ে যাওয়া হবে। তাই যাঁরা ফ্রি পাস না থাকায় স্টেডিয়ামে ঢুকতে পারবেন না, তাঁরা ক্রিকেটারদের ভিক্ট্রি প্যারেডের সময়েই দেখতে পারবেন। কিন্তু তাঁদের জানাই ছিল না যে, ট্রাফিক পুলিশ ভিক্ট্রি প্যারেড আগেই বাতিল করে দিয়েছে। দেখা গেল, সংবর্ধনার শেষে RCB টিমকে খোলা বাসে নয়, চারদিক বন্ধ থাকা বাসেই স্টেডিয়ামের দিকে রওনা দিতে।
দুর্ঘটনা শুরু হয় বিকেল চারটে নাগাদ। স্টেডিয়ামের ৩ নম্বর গেট আংশিক খোলা পেয়ে সেখান দিয়ে কাতারে কাতারে মানুষ ঢুকতে চেষ্টা করেন। তাঁদের কারও হাতে ফ্রি পাস ছিল, কিন্তু বেশিরভাগেরই সেই পাস ছিল না।
দুর্ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী, লিঙ্গরাজাপুরম এলাকার বাসিন্দা ইনায়াথ বলেন, “বন্যার সময় জলের স্রোত যেমন হুহু করে ঢোকে, ঠিক তেমনই স্টেডিয়ামের ৩ নম্বর গেট দিয়ে লোক ঢুকতে গেল। অনেকেই হুমড়ি খেয়ে মাটিতে পড়ে গেল। আর, তাদের মাড়িয়ে লোক স্টেডিয়ামের ভিতরে ঢুকতে শুরু করল। কোনো পুলিশ ছিল না ভিড় নিয়ন্ত্রণ করার।”
প্রশাসনের ভুল অনুমান: দায় কার?
সেলিব্রেশনে কত লোক হবে, প্রশাসন যে আদৌ তা আন্দাজই করতে পারেনি, তার ইঙ্গিত দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী সিদ্দারামাইয়াও। তিনি জানিয়েছেন, বিধান সৌধের সামনে এবং রাস্তায় ২-৩ লক্ষ লোক ছিল। প্রশাসন এবং কর্নাটক স্টেট ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন আশাই করেনি অত লোক হবে। চিন্নাস্বামী স্টেডিয়ামে কমবেশি ৩৫ হাজার দর্শক খেলা দেখেন। প্রশাসন ভেবেছিল, খুব বেশি হলে তার চেয়ে সামান্য বেশি লোক হবে।
এই মর্মান্তিক ঘটনা আবারও প্রমাণ করে দিল যে, খেলার প্রতি মানুষের আবেগ যতই তীব্র হোক না কেন, প্রশাসনের সঠিক পরিকল্পনা ও পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়া তা ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। এই ১১টি প্রাণের বিনিময়ে কি আমরা আবারও শিখতে পারবো?