বিশেষ: রথযাত্রা থেকে অম্বুবাচী সাথে বিপত্তাতারিণী পুজো, দেখেনিন জুনের ব্রত-উৎসবের দিনক্ষণ?

বৈচিত্র্যে ভরা ভারতের সংস্কৃতিতে প্রতিটি ঋতু পরিবর্তনই যেন এক নতুন উৎসবের আগমন বার্তা নিয়ে আসে। ২০২৫ সালের জুন মাসও তার ব্যতিক্রম নয়। পঞ্জিকা অনুসারে, এই মাসটি কেবল তাপমাত্রার পরিবর্তন নয়, বরং একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ উৎসব ও পুজোতে ভরপুর। মাসভর রয়েছে নানা ধর্মীয় রীতি-নীতি পালনের সুযোগ, যা ভারতীয় সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। জামাইষষ্ঠীর আনন্দ থেকে শুরু করে রথযাত্রার জৌলুস – জুন মাস সেজে উঠেছে এক বর্ণিল উৎসবে। আসুন, এক নজরে দেখে নিই এই মাসের গুরুত্বপূর্ণ পুজো-পার্বণের দিনগুলি:

জুন মাসের ব্রত-উৎসবের দিনপঞ্জী:

  • ১ জুন ২০২৫ (রবিবার): জামাইষষ্ঠী – জামাই আপ্যায়নের এই বিশেষ দিনে বাঙালি পরিবারগুলো মেতে উঠবে উৎসবে।
  • ৩ জুন ২০২৫ (মঙ্গলবার): লোকনাথ তিরোধান – বাবা লোকনাথের ভক্তরা এই দিনে তাঁর তিরোধান তিথি পালন করবেন।
  • ৫ জুন ২০২৫ (বৃহস্পতিবার): দশহরা ও গঙ্গাপুজো – পবিত্র গঙ্গা নদীর প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের এই দিনে গঙ্গা স্নান ও পুজো অত্যন্ত পুণ্যের কাজ বলে বিবেচিত হয়।
  • ৭ জুন ২০২৫ (শনিবার): ইদ-অল-আদাহ বা বকরি ইদ – মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান উৎসব, যা ত্যাগের মহিমা স্মরণ করিয়ে দেয়।
  • ১১ জুন ২০২৫ (বুধবার): জগন্নাথদেবের স্নানযাত্রা – স্নানযাত্রার এই পুণ্যদিনে ভক্তরা জগন্নাথদেবকে দর্শন করে তাঁর আশীর্বাদ প্রার্থনা করবেন।
  • ২২ জুন (রবিবার) থেকে ২৫ জুন (বুধবার) ২০২৫: অম্বুবাচী – ধরিত্রী মাতার ঋতুমতী হওয়ার এই বিশেষ পর্ব হিন্দু ধর্মানুসারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
  • ২৭ জুন ২০২৫ (শুক্রবার): রথযাত্রা – ওড়িশা ও পশ্চিমবঙ্গে রথযাত্রা এক বিশাল উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে পালিত হয়।
  • ২৮ জুন ২০২৫ (শনিবার): বিপত্তারিণী পুজো – দেবী দুর্গার অন্যতম রূপ মা বিপত্তারিণীর পুজো করে বিপদ থেকে মুক্তি প্রার্থনা করা হয়।

জগন্নাথদেবের স্নানযাত্রা: সৌভাগ্য ও সমৃদ্ধির দিন

জগন্নাথদেবের স্নানযাত্রার দিনটিকে হিন্দু ধর্মে অত্যন্ত শুভ বলে মনে করা হয়। বিশ্বাস অনুযায়ী, এই বিশেষ তিথিতে কয়েকটি নিয়ম মেনে চললে সারা বছর ভাগ্য ভালো থাকে। ভক্তি মনে এই বিশেষ তিথিতে কিছু নিয়ম মানলে সারাবছর সুখ-‌শান্তিতে ভরে ওঠে পারিবারিক জীবন। এই বছর জগন্নাথদেবের স্নানযাত্রা পড়েছে ১১ জুন বুধবার। এই বিশেষ দিনে সকালে জগন্নাথের স্নানযাত্রা সম্পন্ন করতে পারলে, তা অত্যন্ত শুভ ফলদায়ক বলে মনে করা হয়।

অম্বুবাচী: ধরিত্রীর ঋতুকাল

হিন্দু ধর্মের এক গুরুত্বপূর্ণ বাৎসরিক উৎসব হলো অম্বুবাচী। এই উৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে শাস্ত্রের নানা কাহিনি। ভারতের একাধিক স্থানে অম্বুবাচী উৎসব ‘রজঃউৎসব’ নামেও পালিত হয়। হিন্দু শাস্ত্রে ও বেদে পৃথিবীকে ‘মা’ বলা হয়ে থাকে, এমনকী পৌরাণিক যুগেও পৃথিবীকে ধরিত্রী মাতা বলে সম্বোধন করা হয়েছে। মনে করা হয়, আষাঢ় মাসে মৃগশিরা নক্ষত্রের চতুর্থ পদে ঋতুমতী হন ধরিত্রী। পূর্ণ বয়স্কা ঋতুমতী নারীরাই কেবল সন্তান ধারণে সক্ষম হন, তাই অম্বুবাচীর পর ধরিত্রীও শস্য-শ্যামলা হয়ে ওঠেন বলে বিশ্বাস করা হয়। অম্বুবাচী শুরুর পর তিন দিন চলে এই উৎসব। চলতি বছরে অম্বুবাচী প্রবৃত্তিঃ অর্থাৎ শুরু হবে ২২ জুন (৭ আষাঢ়) রাত ১১টা ৩ মিনিট ৫৭ সেকেন্ডে এবং ২৫ জুন (১০ আষাঢ়) বিকেল ৪টা ২৪ মিনিট ১৩ সেকেন্ডে এর নিবৃত্তিঃ অর্থাৎ সমাপ্তি হবে।

রথযাত্রা: ভক্তি ও উৎসবের মিলন

বছরভর নানা অনুষ্ঠান উদযাপন করে ভারতবাসী। সেরকমই একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উৎসব হলো রথযাত্রা। ভারতের ওড়িশা ও পশ্চিমবঙ্গে মূলত এই উৎসব বিশেষ উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে পালন করা হয়। জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার রথে চড়ে মাসির বাড়ি যাওয়ার এই মহোৎসব অনুষ্ঠিত হবে ২৭ জুন (শুক্রবার)। দ্বিতীয়া তিথি শুরু হচ্ছে ৬ জুলাই রাত ৪টা ২ মিনিট ৩৫ সেকেন্ডে এবং শেষ হচ্ছে ৭ জুলাই রাত ৪টা ৩১ মিনিট ৪০ সেকেন্ডে।

বিপত্তারিণী পুজো: বিপদনাশিনীর আরাধনা

আষাঢ় মাসের রথযাত্রা থেকে উল্টোরথের মধ্যে যে শনিবার ও মঙ্গলবার পড়ে, সেই দিনগুলিতেই বিপত্তারিণীর ব্রত পালন করা হয়। হিন্দু ধর্মে বিপত্তারিণী ব্রতের গুরুত্ব অনেক। দেবী দুর্গা ১০৮ অবতারের অন্যতম এবং দেবী সঙ্কটনাশিনীর একটি রূপ মা বিপত্তারিণী। প্রতি বছর সাধারণত দু’দিন করে পড়ে বিপত্তারিণী পুজো। এবছর প্রথম বিপত্তারিণীর ব্রত পালন করা যাবে ২৮ জুন (শনিবার)

জুন মাসের এই উৎসবমুখর দিনগুলি ভারতের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে আরও সমৃদ্ধ করবে, এবং ভক্তদের জন্য বয়ে আনবে আধ্যাত্মিক শান্তি ও আনন্দ।