‘আরও অনেকে জড়িত!’ মালদা ঠিকা ব্যবসায়ী খুনের রহস্য খতিয়ে দেখছে পুলিশ

মালদার রতুয়া ২ নম্বর ব্লকের ঠিকাদার ব্যবসায়ী সাদ্দাম নাদাপের নৃশংস হত্যাকাণ্ডে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। ভাসুরপোকে খুনের পর দেহ দু’টুকরো করে চিলেকোঠার দেওয়ালে গেঁথে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তার দূর সম্পর্কের কাকিমার বিরুদ্ধে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, একজন শক্তসমর্থ ৩১ বছর বয়সী যুবককে কি একজন মহিলা একা খুন করতে পারেন? এই প্রশ্নই ভাবাচ্ছে তদন্তকারীদের। প্রাথমিকভাবে পুলিশের ধারণা, শুধু অভিযুক্ত মহিলা নন, এই ঘটনায় আরও কেউ বা কারা জড়িত থাকতে পারে। অভিযুক্ত মহিলা কোনো সুপারি কিলার নিয়োগ করেছিলেন কি না, সে বিষয়টিও খতিয়ে দেখছে দক্ষিণ দিনাজপুরের তপন থানার পুলিশ।

রহস্যের সূত্রপাত ও দেহাংশ উদ্ধার
গত সোমবার দক্ষিণ দিনাজপুরের তপন এলাকায় অভিযুক্ত মহিলার বাপের বাড়ি থেকে মৃত ব্যবসায়ী সাদ্দাম নাদাপের দেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনাটি সামনে আসতেই ধৃত মহিলাকে দফায় দফায় জেরা করা হচ্ছে। মালদা জেলা পুলিশ ইতিমধ্যেই জানিয়েছে যে, দূর সম্পর্কের কাকিমা হলেও নিহত সাদ্দামের সঙ্গে অভিযুক্তের ঘনিষ্ঠতা ছিল।

পুলিশকে মহিলা জানিয়েছেন, সাদ্দাম নাকি তাকে বিভিন্নভাবে ব্ল্যাকমেইল করতেন এবং একজন মহিলার উপর যতরকম অত্যাচার করা যায়, তা নাকি তিনি করেছেন। সে কারণেই নিজেই পরিকল্পনা করে সাদ্দামকে তার বাপের বাড়ি, অর্থাৎ তপন থানার সিহুর গ্রামে নিয়ে যান।

নৃশংসতার বিবরণ: একার পক্ষে সম্ভব?
অভিযুক্তের দাবি, মালদা শহর থেকে সাদ্দাম নিজের স্কুটারে তার বাপের বাড়ি যান। মাঝরাতে ধারালো অস্ত্র দিয়ে সাদ্দামকে খুন করেন তিনি। প্রথমে মাথায় অস্ত্রের কোপ বসিয়ে এরপর গলা কেটে দেন। এরপর মৃত ব্যবসায়ীর দেহ বাড়ির চিলেকোঠার ঘরের দেওয়ালে ভরে বাইরে থেকে ইট গেঁথে দেন বলে তিনি জানিয়েছেন।

তবে পুলিশের দাবি, অভিযুক্ত যতটা সাধারণভাবে ঘটনার কথা স্বীকার করেছেন, বাস্তবে তার একার পক্ষে এই কাজ করা ভীষণ কঠিন। আরও বড় বিষয় হলো, অভিযুক্তের স্কুল শিক্ষক স্বামী রহমান নাদাপ পুলিশকে জানিয়েছেন, ১৭ মে তার স্ত্রী বাপের বাড়ি যান এবং ২০ মে তিনি স্ত্রীকে বাড়ি নিয়ে আসেন। কিন্তু, বাড়ি ফেরার পর থেকে অভিযুক্ত মহিলা সবসময় ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে থাকতেন। এই নিয়ে বারবার তাকে প্রশ্ন করা হলেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

তদন্তের গতিপথ: অনেক প্রশ্নের উত্তর বাকি
রহমানের বক্তব্যে তদন্তকারীদের অনুমান, মহিলা একা এই ঘটনা ঘটাননি। মৃতদেহের সঙ্গে উদ্ধার হওয়া ধারালো অস্ত্রটি দেখে তাদের অনুমান, অস্ত্রটি কসাইখানায় মাংস কাটায় ব্যবহার করা হয়। অভিযুক্ত মহিলা সেই অস্ত্র কোথায় পেলেন, তা জানার চেষ্টা করা হচ্ছে। এছাড়া, সেদিন যে স্কুটারে সাদ্দাম মহিলার বাপের বাড়ি গিয়েছিলেন, সেই স্কুটারটির খোঁজ পাওয়া যায়নি। সেটি কোথায় গেল, তদন্ত করে সেটাও জানার চেষ্টা করছে পুলিশ।

তদন্তকারী পুলিশ অফিসাররা জানাচ্ছেন, তদন্তে সবাইকেই স্ক্যানারে রাখা হয়েছে। বেশ কয়েকজনের ফোন কল ডিটেইলস এবং সোশ্যাল মিডিয়া খতিয়ে দেখা হচ্ছে। মঙ্গলবার বিকেল ৪টের পর দেহ মালদা পৌঁছনোয় ময়নাতদন্ত করা সম্ভব হয়নি। আজ (বুধবার) মালদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে সাদ্দামের দেহের ময়নাতদন্ত করা হবে। রিপোর্ট পাওয়ার পর মৃত্যুর সঠিক কারণ জানা যাবে বলে জানিয়েছে পুলিশ। পুলিশ সুপার প্রদীপকুমার যাদব বলেন, “গোটা ঘটনা নিয়ে তদন্ত চলছে। তদন্তে সবকিছুই খতিয়ে দেখা হচ্ছে।”

পরিবারের দাবি: টাকার জন্যই খুন, আরও অনেকে জড়িত
মঙ্গলবারও রতুয়া ২ নম্বর ব্লকের পুখুরিয়া গ্রাম পঞ্চায়েতের কোকলামারি গ্রামে সাদ্দামের বাড়িতে শোকের আবহ। তার দাদা মিঠুন নাদাপ বলেন, “শুধুমাত্র টাকার জন্য আমার ভাইটাকে খুন হতে হয়েছে। ভাই অনেক টাকা নিয়ে কাজ করতেন। ওর নিজেরই দেড় কোটি টাকা ব্যবসায় ব্যবহার করেছিলেন। ওকে খুন করার জন্য অনেকদিন ধরে পরিকল্পনা করা হয়েছে। ২৫ লক্ষ টাকা সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন। ভাইকে খুনের পিছনে অনেকে জড়িত রয়েছে। আরও যদি টাকা লাগত তাহলে ওরা তো আমাদের বলতে পারত! আমরা চার ভাই। প্রয়োজনে জমি-বাড়ি বিক্রি করে টাকা দিতাম। আমরা চাই, এই ঘটনায় যারা জড়িত আছে, তাদের কঠোর শাস্তি হোক।”

নিহত সাদ্দামের স্ত্রী নাসরিন খাতুনও মনে করছেন, এই ঘটনার পিছনে অনেক জড়িত রয়েছে। তিনি বলেন, “ওদের সঙ্গে স্বামীর ঝগড়া ছিল। কিন্তু তাকে খুন করার জন্য কীভাবে ষড়যন্ত্র করা হয়েছিল সেটা জানি না। তবে টাকার জন্যই অভিযুক্ত আর তার স্বামী রহমান নাদাপ আমার স্বামীকে মেরে ফেলল। এর মধ্যে রহমানের শ্বশুর-শাশুড়ি আর সরাফ নাদাপও যুক্ত রয়েছে। অভিযুক্ত মহিলার বন্ধুও এই ঘটনায় জড়িত। ওরা আমাদের দূর সম্পর্কের আত্মীয় হয়। আমি ওদের সবার শাস্তি চাই।”

এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে আসলে কী রহস্য লুকিয়ে আছে, তা জানতে আরও কিছুটা সময় লাগতে পারে। তবে পরিবার এবং পুলিশের প্রাথমিক অনুমান, এই নৃশংসতার পেছনে রয়েছে সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র এবং একাধিক ব্যক্তির যোগসাজশ।