এ যেন তীক্ষ্ণ ছোরা…! নয়া শিকারি প্রাণী ঘিরে তোলপাড় দিঘা

সমুদ্রের অতলান্তিকে লুকিয়ে থাকা রহস্যের যেন শেষ নেই! এবার বঙ্গোপসাগরের বুকেও মিলল এক নতুন প্রাণের সন্ধান। দিঘা মেরিন অ্যাকোরিয়াম অ্যান্ড রিজিওনাল সেন্টারের অনুসন্ধানী বিজ্ঞানীরা খুঁজে পেয়েছেন এক নতুন প্রজাতির মুক্তজীবী সামুদ্রিক নেমাটোড। দিঘার চম্পা নদীর মোহনায়, জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার বিজ্ঞানীদের এই আবিষ্কার যেন এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করল।

এই রোমাঞ্চকর গবেষণাপত্রটি চলতি মে মাসের ২৭ তারিখে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান জার্নাল ‘থালাসাস’-এর অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে। বিজ্ঞানীদের মতে, এই নতুন প্রজাতির মুক্তজীবীর আবিষ্কার এই অঞ্চলের জীববৈচিত্র্যের প্রাচুর্যকে আরও একবার প্রমাণ করল। ম্যানগ্রোভ জলাভূমি দ্বারা পরিবেষ্টিত এই পুষ্টিকর আবাসস্থল যে বেন্থিক সম্প্রদায় এবং উৎপাদনশীলতাকে কতটা সমৃদ্ধ করে, তা এই আবিষ্কারের মধ্যে দিয়ে স্পষ্ট।

এই গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার কাণ্ডারি ছিলেন বিজ্ঞানী ড. এস. বালাকৃষ্ণান। তাঁর সঙ্গে এই অভিযানে সামিল ছিলেন মিস চৈতি মান্না এবং ড. কাপুলি গণি মোহাম্মদ থামিমুল আনসারি। ড. বালাকৃষ্ণান স্বয়ং জানিয়েছেন, ভারতীয় জলভাগে শিকারী মুক্তজীবী সামুদ্রিক নেমাটোড প্রজাতির এটাই প্রথম আনুষ্ঠানিক নথিভুক্তকরণ। গবেষকদের দলটি গত বছর ১৪ অগাস্ট চম্পা নদীর যেখানে বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে মিলন ঘটেছে, সেই আন্তঃজোয়ার অঞ্চলের প্রায় ১০ সেন্টিমিটার গভীরতা থেকে সংগ্রহ করা পলির নমুনার মধ্যে এই নতুন নেমাটোড প্রজাতিটির সন্ধান পান। সাধারণভাবে নেমাটোডরা পরজীবী হিসেবেই বেশি পরিচিত হলেও, এদের মুক্তজীবী রূপের বিশাল বৈচিত্র্য প্রায় সকল প্রকার আবাসস্থলেই বিদ্যমান।

এই নব-আবিষ্কৃত প্রজাতিটির নামকরণ করা হয়েছে Parasphaerolaimus bengalensis sp. nov.। এটি মনহাইস্টেরিডা বর্গের অন্তর্ভুক্ত এবং এর কিছু স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য রয়েছে। পুরু ও সরু দেহ, বড় বাক্কাল ক্যাভিটি, ডোরাকাটা কিউটিকলে ল্যাটেরাল আলা-র উপস্থিতি, ছোট সেফালিক ও সাবসেফালিক সেটে, অসংখ্য অনুদৈর্ঘ্য সারি সার্ভাইকাল সেটে এবং গোলাকার ডিস্টাল এন্ড-সহ স্পিকিউল এটিকে একই গণের অন্যান্য প্রজাতি থেকে আলাদা করেছে।

এই আবিষ্কার সামুদ্রিক জীবনের সেই বিশাল ও অনাবিষ্কৃত ভান্ডারের দিকে আলো ফেলল, যার সম্পর্কে আমরা এখনও অনেক কিছুই জানি না। সামুদ্রিক পলিতে মুক্তজীবী নেমাটোডরা সংখ্যায় সবচেয়ে প্রভাবশালী প্রাণী হলেও, তারা খাদ্যজালে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শুধু তাই নয়, এরা পরিবেশগত সূচক প্রজাতি হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ, যারা দূষণের প্রতি সংবেদনশীল। এদের জনসংখ্যার কাঠামো পরিবেশের স্বাস্থ্য সম্পর্কে অনেক তথ্য দিতে পারে।

সুতরাং, বঙ্গোপসাগরের এই নতুন ‘রহস্য’ কেবল জীববিজ্ঞানের পাতায় নতুন একটি নাম যোগ করল না, বরং সামুদ্রিক জীবনের জটিল জাল সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানকেও আরও সমৃদ্ধ করল। সমুদ্রের গভীরে এখনও কত অজানা জীব লুকিয়ে আছে, কে জানে!