“টাকার লোভে দেশের নিরাপত্তা বিক্রি”-CRPF জওয়ানকে গ্রেফতার করলো NIA

দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় এক গভীর ফাটল! ক্রমান্বয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও গোয়েন্দা তথ্য পাকিস্তানের হাতে পাচারের অভিযোগে কেন্দ্রীয় রিজার্ভ পুলিশ ফোর্স (CRPF)-এর অ্যাসিস্ট্যান্ট সাব-ইনস্পেক্টর (ASI) মোতিরাম জাটকে গ্রেফতার করেছে জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা (NIA)। কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সূত্র বলছে, পাকিস্তানের সেনা বা আইএসআই-এর কাছ থেকে সংবাদের পরিভাষায় নির্ধারিত ‘পে-প্যাকেজ’ পেতেন মোতিরাম, যা এনআইএ গোয়েন্দাদের হতবাক করে দিয়েছে।
টাকার বিনিময়ে ‘খবর’ পাচার: এক চাঞ্চল্যকর ‘পে-প্যাকেজ’
গোয়েন্দা সূত্রের দাবি অনুযায়ী, মোতিরাম জাটের ‘পে-প্যাকেজ’ ছিল বেশ চমকপ্রদ। সিআরপিএফ ও সেনাবাহিনীর মুভমেন্টের খবর ছিল ‘ব্রেকিং নিউজ’, যার মূল্য ছিল ৩৫০০ টাকা। জম্মু-কাশ্মীরে ‘ভিআইপি মুভমেন্ট’-এর আগাম খবর ছিল ‘এক্সক্লুসিভ নিউজ’, যার জন্য মিলত ১২,০০০ টাকা। আর জঙ্গিদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত সেনা অপারেশনের আগাম তথ্য, বা গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনার (Vital Installation) ম্যাপ ছিল ‘সেনসেশনাল নিউজ’-এর তালিকায়, যার মূল্য ছিল ২৫,০০০ টাকা। এর উপরে প্রতি মাসে ৪০,০০০ টাকা ‘পারফরমেন্স মান্থলি ইনসেনটিভ’ তো ছিলই!
এনআইএ গোয়েন্দারা বিস্ময় প্রকাশ করে বলছেন, “এমনিতে সিআরপিএফ থেকে নিয়মিত বেতন পেতেন। তার উপরে প্রতি মাসে ৪০ হাজার। তা ছাড়াও খবর পাঠালেই আলাদা করে টাকা। তা হলেই বুঝুন গত দু’বছরে কত টাকা কামিয়েছিলেন মোতিরাম।” মোতিরামকে জেরা করেই তাঁর এই ‘পে-প্যাকেজ’ সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য হাতে এসেছে গোয়েন্দাদের।
রহস্যময়ী নারী সাংবাদিকের ছদ্মবেশে পাকিস্তানি গুপ্তচর
এই গুপ্তচর বৃত্তির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে এক সুন্দরী মহিলার নামও। এনআইএ-র দাবি, পাকিস্তান থেকে তিনিই নাকি মোতিরামের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। মোতিরামকে জেরা করে জানা গিয়েছে, ওই মহিলা নিজেকে পাকিস্তানে কর্মরত একটি ভারতীয় টেলিভিশন চ্যানেলের সিনিয়র জার্নালিস্ট হিসেবে পরিচয় দিতেন। তিনিই মোতিরামের কাছ থেকে সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহ করতেন। সেই তথ্যের বিনিময়ে প্রাপ্য অর্থ মোতিরাম এবং তার স্ত্রীর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ডিজিটাল পেমেন্টের মাধ্যমে নিয়মিত আসত বলে গোয়েন্দাদের দাবি।
গোয়েন্দাদের ধারণা, মোতিরামকে বোঝানো হয়েছিল যে তার পাঠানো তথ্য টেলিভিশন চ্যানেলের জন্য ব্যবহার করা হবে। তাই ‘পে-প্যাকেজ’ নির্ধারণের ক্ষেত্রেও ‘নিউজ’ এর পরিভাষাকেই ব্যবহার করা হতো। শুধু সেনা মুভমেন্ট নয়, সিআরপিএফ এবং কাশ্মীর পুলিশের অফিসারদের বদলি ও পোস্টিং সংক্রান্ত তথ্যও ‘ব্রেকিং নিউজ’ হিসেবে গণ্য হতো।
‘সেনসেশনাল নিউজ’ এবং সন্দেহজনক ফোন কল
পাক মদতপুষ্ট জঙ্গিদের অপারেশনের নথি, স্কুল, মন্দির, হাসপাতাল-এর মতো ‘সফট টার্গেট’ সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণও ‘সেনসেশনাল নিউজ’ হিসেবে গণ্য হতো। কেন্দ্রীয় গোয়েন্দারা বলছেন, “মোতিরাম বাচ্চা ছেলে নয়। তার উপরে নিরাপত্তা বাহিনীতেই কাজ করতেন। এই ধরনের সমস্ত তথ্যই যে শেয়ার করা যায় না, সেটা তার জানাই ছিল। তার উপরে টাকার বিনিময়ে তথ্য পাচারের পিছনেও তার নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য ছিল, সেটা প্রমাণিত।”
আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। পহেলগামে জঙ্গি হামলার মাত্র সাত দিন আগে মোতিরামকে পহেলগাম থেকে দিল্লিতে বদলি করা হয়েছিল। কিন্তু দিল্লিতে ফিরেও তার ‘ব্রেকিং নিউজ’ পাঠানোর অভ্যাস বন্ধ হয়নি। গোয়েন্দাদের অভিযোগ, পহেলগাম হামলার পর কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের কাশ্মীর সফরের খবরও মোতিরামই শুধুমাত্র টাকার লোভে সীমান্তের ওপারে পৌঁছে দিয়েছেন। এই তথ্যকে মোতিরাম ‘এক্সক্লুসিভ নিউজ’ শ্রেণিতে ফেলার দাবি জানান। কিন্তু সীমান্তের ওপার থেকে আসা ‘সুন্দরী জার্নালিস্ট’ তাতে রাজি না হলে তাদের মধ্যে বিবাদও হয়।
এনআইএ সূত্রের দাবি, সেই বিবাদ মেটাতে এরপর এক ব্যক্তির ফোন আসে। সীমান্তের ওপার থেকে তিনি নিজেকে ওই ‘নিউজ চ্যানেলের বস’ পরিচয় দিয়ে মোতিরামকে আশ্বস্ত করেন যে, তার দেওয়া তথ্যের সঠিক মূল্যায়ন হবে এবং মোতিরাম তার ন্যায্য প্রাপ্য পাবেন। গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, এই কথোপকথনের কিছু প্রমাণ মোতিরামের মোবাইল ফোনের চ্যাট হিস্ট্রিতে এবং বাকিটা তাকে জেরা করে পাওয়া গিয়েছে। গোয়েন্দারা নিশ্চিত যে, ওই ‘বস’ আসলে আইএসআই-এরই কোনো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।
তদন্তের জাল বিস্তৃতি: ‘দোসর’দের খোঁজে এনআইএ
গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে মোতিরামকে ইতিমধ্যে চাকরি থেকে বরখাস্ত করেছে সিআরপিএফ। সে এখন এনআইএ-র হেফাজতে রয়েছে। গোয়েন্দারা জানতে পেরেছেন, মোতিরাম যে টাকা পেতেন, তা একাধিক ভারতীয় ফোন থেকে ডিজিটাল পেমেন্টের মাধ্যমে আসত। এনআইএ এখন এই টাকার উৎস এবং জড়িত ব্যক্তিদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে। গোয়েন্দা সূত্র দাবি করছে, তাদের পেলে বড় ‘ব্রেক থ্রু’ হতে পারে। পাকিস্তানের ওই মহিলা জার্নালিস্ট এবং তার ‘বস’ (পাকিস্তানি গুপ্তচর)-এর আসল পরিচয় কী, এবং এই গুপ্তচর সিন্ডিকেটে মোতিরামের সম্ভাব্য ‘দোসর’ কারা, তারও খোঁজ চলছে। দেশের নিরাপত্তা বিরোধী এই গুরুতর অপরাধে জড়িত সকলের মুখোশ উন্মোচনে বদ্ধপরিকর এনআইএ।